একসময় রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে এবার নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের অত্যাধুনিক একটি কারাগার।
দীর্ঘদিন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দখলে থাকা এবং দেড় লাখের বেশি মানুষকে জিম্মি করে রাখা এই পাহাড়ি এলাকাকেই এখন অপরাধ সংশোধন ও পুনর্বাসনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৭০ একর জমির ওপর নির্মিতব্য এই কারাগারে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতে বিচারাধীন প্রায় দুই হাজার বন্দিকে স্থানান্তর করা হবে।
জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী এবং নগরীর বায়েজিদ, পাহাড়তলী ও খুলশী এলাকার সীমান্তবর্তী একটি পাহাড়ি অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। কয়েক মাস আগেও সেখানে এক র্যাব সদস্যকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এলাকাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসায় সেখানে আধুনিক কারাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে ৭০ একর জমি বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, বর্তমান কারাগার অতিরিক্ত বন্দির চাপে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি বন্দি থাকায় সেখানে ওভারলোড পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মেগা সিটির প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন একটি আধুনিক কারাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-এর ১৪০ বছর পুরোনো স্থাপনাটির ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৪৯ জন হলেও সেখানে বন্দি রয়েছেন ৬ হাজার ৩৩৮ জন। এর মধ্যে মহানগর আদালতে বিচারাধীন মামলায় আটক প্রায় দুই হাজার বন্দিকে নতুন কারাগারে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষের ডিআইজি মো. ছগির মিয়া জানান, নতুন কারাগারে মেট্রো এলাকার হাজতি ও কয়েদিদের রাখা হবে। এতে জেলা ও মহানগরের বন্দিদের আলাদাভাবে রাখা সম্ভব হবে এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও দক্ষতা বাড়বে।
কারা প্রশাসন জানিয়েছে, অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পেলেই দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি শুধু বন্দি রাখার জায়গা হবে না; বরং পুনর্বাসন, শিক্ষা, খেলাধুলা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও থাকবে সেখানে। যাতে মুক্তির পর বন্দিরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে সমাজে পুনর্বাসিত হতে পারেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, আধুনিক কারাগারের ধারণা অনুযায়ী বন্দিদের জন্য সীমিত শিক্ষা, খেলাধুলা এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হবে, যাতে তারা সংশোধিত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে না পড়েন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পাহাড়ি এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পরিকল্পিতভাবে কারাগার নির্মাণের বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে পরিকল্পিতভাবে কারাগার নির্মাণ করা গেলে এটি মানবাধিকার ও উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে।
0 মন্তব্য