ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবসের পঞ্চাশ বছর পূর্তি আজ। বাঁধ নির্মাণ করে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদ এবং পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে লংমার্চ হয়। রাজশাহী থেকে ভারতের ফারাক্কা অভিমুখে শুরু হওয়া লাখো মানুষের লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট হাইস্কুল ময়দানে বিশাল সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। সমাবেশে ভারতকে কঠোর বার্তা দেন মওলানা ভাসানী। তার এই লংমার্চ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে ভারত। ফারাক্কার বিষয়ে সমঝোতায় আসার প্রতিশ্রুতি দেয় দেশটি। সেই থেকে দিনটি (১৬ মে) ফারাক্কা দিবস নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতিবারের মতো এবারও বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে।
১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে ভারত। এর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ভাটির দেশ বাংলাদেশে ভয়াবহ ভূ-প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে অর্ধেক হয়ে যায়। একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি, সেচ, মৎস্য, পণ্য পরিবহণ ও নৌচলাচলে গভীর সংকট দেখা দেয়। পদ্মা অববাহিকার প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ব্যাপক সংকটে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু মরুভূমিতে পরিণত হয় পদ্মার উজানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ভাটিতে ফরিদপুর পর্যন্ত ১৯৬ কিলোমিটার নদী অববাহিকা। ফারাক্কার মরণঘাতী এই প্রভাব দেখে চুপ করে বসে থাকতে পারেননি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন তিনি। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চের ডাক দেন মওলানা। সেদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অগণিত মানুষ তার ডাকে সাড়া দেন। ভারতবিরোধী ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে প্রতিবাদী জনতার ঢল নামে। এখান থেকেই ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ শুরু হয়। পানির দাবিতে পৃথিবীর ইতিহাসে এটি ছিল এক অবিস্মরণীয় প্রতিবাদের ঘটনা।
রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে লংমার্চ শুরু হয় সকাল ১০টায়। জনতার স্রোত গোদাগাড়ীর প্রেমতলীতে গিয়ে পৌঁছায় দুপুর ২টায়। সন্ধ্যা ছয়টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজ মাঠে গিয়ে লংমার্চের যাত্রাবিরতি ঘটে। পরের দিন সকাল ৮টায় পুনরায় যাত্রা শুরু হয় কানসাট অভিমুখে। এরপর ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট হাইস্কুল মাঠে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। মওলানার ডাকে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ সমাবেশে যোগ দেন।
সমবেত জনতার উদ্দেশে মওলানা বলেন, ‘আজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হলো তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির রুখে দাঁড়ানোর জ্বলন্ত নজির। নিঃসন্দেহে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে।’ ফারাক্কা বাঁধকে মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের জন্য মরণবাঁধ আখ্যা দিলে মুহূর্তেই লাখো মানুষের স্লোগানে কানসাট হাইস্কুল মাঠ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। আওয়াজ ওঠে ‘ভেঙে দাও-গুঁড়িয়ে দাও মরণবাঁধ ফারাক্কা।’
এই লংমার্চের পর ফারাক্কা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাতারাতি একটি ইস্যুতে পরিণত হয়। এই ইস্যুকে ভিত্তি করে দেশে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে অব্যাহত আন্তর্জাতিক চাপ এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় ভারত ১৯৭৭ সালে গঙ্গার পানিপ্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি পাঁচসালা চুক্তি করতে বাধ্য হয়।
বাঁধ নির্মাণের ইতিহাস : পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে ভারত গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এর জবাবে ভারত ১৯৫২ সালে জানায়, গঙ্গার বাঁধ নির্মাণ এখনো অনুসন্ধান পর্যায়েই রয়েছে। ১৯৬০ সালে ভারত প্রথম এ ব্যাপারে পাকিস্তানের সঙ্গে বৈঠকে বসে। এ প্রক্রিয়া চলা অবস্থায়ই ১৯৬১ সালে ভারত গঙ্গা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। এভাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগেই ১৯৭০ সালে ফিডারখাল ছাড়া ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ করে ফেলে ভারত।
বাংলাদেশ সীমান্তের মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা নামের স্থানে বাঁধটি অবস্থিত। বাঁধটি দুই হাজার ২৪০ মিটার লম্বা। তৎকালীন সময়ে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের কারিগরি সহায়তায় বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করে ভারত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারত সরকার ফারাক্কা বাঁধ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রথমে ভাগীরথী নদীর ফিডার ক্যানেলে পানিপ্রবাহের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক চালুর কথা বলে মাত্র ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হয়। সেই পরীক্ষামূলক প্রত্যাহারই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়, যা এখনো চলমান আছে। তবে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে হওয়া গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী সীমিত আকারে বাংলাদেশকে পানি দিয়ে আসছে ভারত।
সেচের অভাবে দেশের ৬ কোটি মানুষ : ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চে অংশ নিয়েছিলেন রাজশাহীর নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘যতই দিন গড়াচ্ছে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব ততই মারাত্মক হয়ে উঠছে। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে বাংলাদেশের গঙ্গা ও পদ্মা নদীতে চরের বিস্তার একটি নিয়মিত ঘটনা। এর পাশাপাশি গঙ্গা-পদ্মার শাখা-প্রশাখাসহ শতাধিক নদ-নদী ক্রমান্বয়ে মৃত খালে রূপ নিয়েছে। ফারাক্কার প্রভাবে গঙ্গার ভাটিতে বাংলাদেশের অন্তত ছয় কোটি মানুষ সেচ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি এবং দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের আরও চার কোটি মানুষ সরাসরি ক্ষতির শিকার। ফারাক্কার কারণে গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পে পানির ঘাটতির ফলে ৬৫ শতাংশ এলাকায় সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উজান থেকে স্বাদু পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে গেছে, যার ফলে মাটির উর্বরতা কমে এসেছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের শতভাগ অগভীর নলকূপ এবং অনেক এলাকার গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। আর্সেনিক দূষণের কারণে অনেক এলাকায় নলকূপের পানি পানযোগ্য নেই।
ভয়াবহভাবে কমে যাচ্ছে পানির প্রবাহ : গবেষকরা বলছেন, প্রতি শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-পদ্মা নদীর প্রবাহ ভয়াবহভাবে কমে যায়। নদীর বুকে গরুর গাড়ি চলে, বালুবাহী ট্রাক চলে, অথচ পানি নেই। ১৯৭৫ সাল থেকে গঙ্গা-পদ্মার প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নৌপথ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। লবণাক্ততার কারণে খুলনা অঞ্চলে ধান উৎপাদন কমে গেছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও স্বাদু পানির অভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
তারা আরও বলেন, পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় পদ্মা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, জলজপ্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে। পানি নেই বলে ইলিশ আর আসে না, ডলফিন আর ঘড়িয়াল বিলুপ্তপ্রায়। পাশাপাশি হারিয়ে গেছে দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং জলজ প্রাণী।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৪ সালের তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে রাজশাহী অংশে গঙ্গার (বাংলাদেশে পদ্মা) আয়তন কমেছে ৫০ শতাংশ, পানির গভীরতা কমেছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রবাহ কমেছে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ। সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ কমেছে ৯০ শতাংশ। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি গঙ্গায় পানিপ্রবাহ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক, যা ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি এসে দাঁড়ায় ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেকে।
পানির হিস্যা আদায় হয়নি আজও : আন্তর্জাতিক চাপ এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় এনে ভারত ১৯৭৭ সালে গঙ্গার পানিপ্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি পাঁচসালা চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল। চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ উপযুক্ত পরিমাণ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছিল, যা সঠিকভাবেই কার্যকর ছিল। ওই চুক্তি অনুযায়ী, বছরের সব থেকে কম প্রবাহের সময়কাল এপ্রিলের শেষ ১০ দিন ফারাক্কার প্রায় ৫৫ হাজার কিউসেক পানির মধ্যে বাংলাদেশ পাবে ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি। আর ভারত পাবে ২০ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি। কোনো কারণে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির পরিমাণ কমে এলে বাংলাদেশ তার প্রাপ্য অংশের ৮০ ভাগ অর্থাৎ ২৭ হাজার ৬০০ কিউসেক পানি পাবে। এটি ছিল চুক্তির গ্যারান্টির একটি অন্যতম শর্ত। ৫ বছর মেয়াদি এই চুক্তিটি জাতিসংঘে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮২ সালে ৫ বছর মেয়াদি চুক্তি শেষ হলে বাংলাদেশ সেটি নবায়ন করতে চাইলেও ভারতের আপত্তির কারণে সম্ভব হয়নি। ওই বছরের ৭ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে গঙ্গার পানিপ্রবাহ নিয়ে চুক্তি নবায়ন না হয়ে একটি সমঝোতা স্মারকপত্র স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতায় ১৯৭৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী পানিবণ্টনের ব্যবস্থাগুলো বহাল থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে ৮০ ভাগ পানি পাওয়ার গ্যারান্টি বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে গঙ্গার পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়। ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে নদী কমিশনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নদী কমিশন গঠনের। ১৯৮২ সালের সমঝোতা স্মারকে সেটিও বাদ দেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশ আর ন্যায্য হিস্যা পায়নি। এছাড়া ১৯৯৬ সালে পানির হিস্যা নিয়ে যে চুক্তি হয়, সেটিও বাস্তবায়ন করেনি ভারত। আগামী ডিসেম্বরে এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে।
লংমার্চ দিবসে কর্মসূচি : ফারাক্কা দিবসে বেলা ১১টায় ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বিএনপি। এতে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ছাড়াও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেবেন।
এদিন বিকালে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে বিভাগীয় সমাবেশ করবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
একই সময়ে রাজশাহীর বড়কুঠি পদ্মার পারে ফারাক্কা লংমার্চ উদযাপন কমিটির আয়োজনে গণসমাবেশ হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। এদিন বিকালে তোপখানায় আলোচনা সভার আয়োজন করেছে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল।
0 মন্তব্য