পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। সরকার গঠনের মাত্র ১০০ দিনের মাথায় একজন পূর্ণমন্ত্রীর পদত্যাগকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদিও পদত্যাগপত্রে তিনি শারীরিক অসুস্থতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ব্যাখ্যাও সামনে আসছে।
সোমবার (১ জুন) সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন দীপেন দেওয়ান। পরে তা গৃহীত হয়। পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছেন এবং অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত দায়িত্ব পালনে সমস্যা হচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি বজায় রাখতে মন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তবে রাজনৈতিক মহলে তার পদত্যাগের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে বলে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন, জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক এবং তিন পার্বত্য জেলার জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে তার মতপার্থক্য ছিল।
একটি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে আন্তরিক ছিলেন এবং জেএসএসের সঙ্গে সংলাপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পাহাড়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জেএসএস প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমার সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়া উচিত বলেও তিনি মনে করতেন।
অন্যদিকে আরেকটি সূত্রের দাবি, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ ও পুনর্গঠন নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দ্রুত পুনর্গঠনের নির্দেশনা থাকলেও এ বিষয়ে ধীরগতির কারণে অসন্তোষ দেখা দেয়।
দীপেন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তার পাশাপাশি চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিও তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কারণ পার্বত্য এলাকার বাইরে থেকে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের ঘটনা আগে ঘটেনি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মনে করে, এ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব স্থানীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের হাতেই থাকা উচিত।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিমন্ত্রী হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে দূরত্বের যে আলোচনা চলছে, তা নাকচ করেছেন তিনি। গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় হেলাল উদ্দিন বলেন, “দীপেন চাচার সঙ্গে আমার কোনো দূরত্ব নেই। আমাদের মধ্যে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রয়েছে।”
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর তার সমর্থকরা রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। তারা দাবি করেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলামও বলেছেন, “দীপেন দেওয়ান শারীরিকভাবে অসুস্থ নন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা দীপেন দেওয়ান কর্মজীবনের শুরুতে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন। ২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের পদ ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০১০ সালে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পরে দলের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপরই তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটি মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের প্রথম পদত্যাগ। দীপেন দেওয়ানের বিদায়ের পর বর্তমানে মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ জন। এর মধ্যে রয়েছেন ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী।
সরকারের সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নতুন রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ হিসেবে অসুস্থতার কথা বলা হয়েছে, তবে এর নেপথ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কোনো জটিলতা ছিল কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট হয়নি।
0 মন্তব্য