ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের অংশ বিক্রির ব্যর্থ পরিকল্পনা ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কে ভুলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে ফিফা। একই সঙ্গে সংস্থাটি জানিয়েছে, মরক্কোতে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ বৈঠকে উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি ‘পূর্ণ সমর্থন’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বুধবার (৬ আগস্ট) এক বিবৃতিতে ফিফা জানায়, সংস্থার মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম এবং বৈঠকে উপস্থিত ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্যরা ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের আস্থা প্রকাশ করেছেন।
বিশ্বকাপের মুনাফার একটি অংশ ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামে একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রির পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ফিফা স্বীকার করেছে যে, “কিছু ভুল হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ভিন্নভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল।”
এ বিষয়ে ফিফা কাউন্সিল ও সদস্য দেশগুলোর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানানো হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ভুল আর না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ফিফার মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রমের এই সমর্থন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, কয়েকদিন আগেই তিনি ফিফার কর্মীদের পাঠানো এক ই-মেইলে ঘটনাগুলোকে “দুঃখজনক ও নিন্দনীয়” বলে উল্লেখ করে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন।
ফিফা আরও জানিয়েছে, ইনফান্তিনোও মহাসচিব গ্রাফস্ট্রমের প্রতি নিজের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে যে, এফএফই-সংক্রান্ত বিতর্কিত প্রস্তাবটি এখন সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিফা ভবিষ্যতে তাদের কার্যপ্রক্রিয়া আরও উন্নত করবে।” তবে একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ফিফার সুনাম, সুশাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে “ভিত্তিহীন আক্রমণ” আর সহ্য করা হবে না এবং প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত শনিবার ব্যাপক সমালোচনার মুখে ইনফান্তিনো ২০ বিলিয়ন ডলারের বিতর্কিত প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এফএফইর প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে ৪.২ বিলিয়ন ডলার তোলার কথা ছিল। সম্ভাব্য প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে ছিল থ্রাইভ ইটার্নাল, যা প্রতিষ্ঠা করেন জশুয়া কুশনার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।
তবে এই বৈঠকের পরও ইনফান্তিনোর ওপর চাপ কমবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বুধবারই ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল লিগগুলোর সংগঠন—যার মধ্যে প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা ও সিরি আ রয়েছে—ফিফার শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানায়। সংগঠনটি এফএফই পরিকল্পনাকে “বিপজ্জনক” আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি ফিফার পরিচালনা, সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
তাদের বক্তব্য, “এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ফিফার সুশাসন সংস্কার প্রয়োজন, যাতে ফুটবলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।”
পর্তুগাল ও রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি ফুটবলার লুইস ফিগোও ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করে বলেন, তিনি সভাপতির পদটির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন।
এদিকে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নিজের নেতৃত্বের সমর্থন আদায়ে ইনফান্তিনো নাকি ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের প্রতিশ্রুতি মরক্কোকে দিয়েছিলেন। তবে ফিফা এই দাবি “মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর” বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
একই দিনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারানোর কথা জানান। তার ভাষায়, ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল ফিফা সভাপতির “মারাত্মক সুশাসন ব্যর্থতা।”
আগামী মার্চে ফিফা সভাপতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য লড়তে চান ইনফান্তিনো। তবে সাম্প্রতিক বিতর্ক তার নেতৃত্বকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা ফিফার বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। একই ধরনের অসন্তোষ প্রকাশ করেছে উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও।
0 মন্তব্য