যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণসহ নিজেদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলবে না বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। রোববার ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী এ অবস্থানের কথা জানায়।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর থেকে ইরান কার্যত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল সীমিত করে রেখেছে। একই সঙ্গে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায়ের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মোহাম্মদ বাকের যুলকাদর শনিবার হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য কয়েকটি শর্ত তুলে ধরেন। এর মধ্যে লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও আগ্রাসন বন্ধের দাবি রয়েছে।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা বাতিল, জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও করেছে তেহরান।
রোববার আইআরজিসি বলেছে, শত্রুপক্ষ তাদের সব দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর অবরোধ বজায় রাখাই তাদের কৌশল। তাদের ভাষায়, হরমুজ এখন শুধু একটি জলপথ নয়, বরং একটি ‘যুদ্ধক্ষেত্র’।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এর আগে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার বিষয়টি শর্তসাপেক্ষ বলে জানিয়েছিলেন। রোববার তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার কথা অস্বীকার করে জানান, তেহরান কেবল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘বার্তা বিনিময়’ করছে।
হরমুজে নৌ চলাচল কমেছে
চলমান উত্তেজনা ও হামলার কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত অভিযোগ করেছে, প্রণালী অতিক্রমের সময় ইরান তাদের জাতীয় তেল কোম্পানির একটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।
পরে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, ওমানের উপকূলে একটি জাহাজ নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেটি একই জাহাজ কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানের নাম উল্লেখ না করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে বারবার হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে প্রণালীর নৌ চলাচল ব্যবস্থা নিয়ে চলমান আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে—এমন যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে দেশটি।
জুনে স্বাক্ষরিত ইরান-মার্কিন সমঝোতায় বলা হয়েছিল, তেহরান ও মাসকাট অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নৌ চলাচল ব্যবস্থা নির্ধারণ করবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ ধরনের জলপথে সাধারণত টোল আদায়ের সুযোগ নেই।
আরাকচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে।
লোহিত সাগরেও উত্তেজনা
হরমুজ প্রণালীতে ইরান নৌ চলাচল সীমিত করার মধ্যেই ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে সমান্তরাল সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে।
রোববার হুথিরা সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলে একটি তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। এর আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ ওই স্থাপনায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানিয়েছিল।
ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে সৌদি আরব। জাতিসংঘের সমর্থনে ২০২২ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ কিছুটা স্থবির হয়েছিল। তবে গত মাসে হুথিদের অবরোধ ঘোষণার পর পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়েছে।
সরকার নিয়ন্ত্রিত মোখা শহরের একটি চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, রোববার হুথিদের হামলায় তিন বেসামরিক নাগরিক ও আট সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন।
হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে তারা ওই এলাকায় ‘সৌদি শত্রু’ বাহিনীর সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এরই মধ্যে শুক্রবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিতে ন্যাটো-ধাঁচের একটি ধারা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, একটি দেশের ওপর হামলা হলে তা তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান শনিবার আশা প্রকাশ করেছেন, মিশরও এই চুক্তিতে যোগ দেবে। তিনি মিশরকে ‘সকল বিষয়ে একটি স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ফিদান বলেন, তিন দেশ ইতোমধ্যে একে অপরের সঙ্গে জোটের সদস্যদের মতোই আচরণ করছে। গত মাসে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে একটি মিশরীয় বন্দরে মার্কিন স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়েছিল। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মিশরের ভূখণ্ডে এটিই এ ধরনের প্রথম হামলা বলে জানা গেছে।
তুরস্ক জানিয়েছে, নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো ‘যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা’।
0 মন্তব্য