ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই। সোমবার বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও পক্ষাঘাতজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন তোফায়েল আহমেদ। গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বাদ মাগরিব রাজধানীর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। আজ মঙ্গলবার হেলিকপ্টারে তার মরদেহ ভোলায় নেওয়া হবে। জোহরের নামাজের পর ভোলা জেলা স্কুল মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও রাজনৈতিক সচিব। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আয়োজিত এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তিনি।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তার পিতা মৌলভী আজহার আলী এবং মাতা ফাতেমা বেগম। সম্প্রতি তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ইন্তেকাল করেন। তিনি একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে রেখে গেছেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৪ সালে বিএসসি সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি ছাত্রলীগের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৮-৬৯ সালে ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন এবং গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি মুজিব বাহিনীর চার আঞ্চলিক প্রধানের একজন ছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তোফায়েল আহমেদ ভোলা-১ আসন থেকে মোট নয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরবর্তীতে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি দেশের অন্যতম পরিচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তার মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
0 মন্তব্য