পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে নানা পাটেকর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে। অভিনয়ের পাশাপাশি স্পষ্টবাদিতা, সাদাসিধে জীবনযাপন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণেও আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন তিনি। খ্যাতি ও অর্থের হাতছানি থাকলেও বিলাসী জীবনযাপনের প্রতি কখনোই খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না এই অভিনেতা।
নানা পাটেকর বরাবরই নিজের মতো করে চলেছেন। ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেসে’র ধার না ধরা, নিজের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা কিংবা কাজের ক্ষেত্রে আপস না করার কারণে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। পরিচালক-প্রযোজকদের সঙ্গে বিবাদের ঘটনাও রয়েছে তার ক্যারিয়ারে। এমনকি নিজের একগুঁয়েমির কারণে বেশ কিছু কাজ হাতছাড়া হয়েছে বলেও শোনা যায়। তবে এসব নিয়ে কখনো খুব একটা আক্ষেপ করেননি তিনি।
অভিনয় প্রতিভার কারণে ক্যারিয়ারের মধ্যগগনেই প্রথম সারির তারকাদের কাতারে জায়গা করে নেন নানা। চাইলে অন্য অনেক তারকার মতো বিলাসী জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তার জীবনযাপন ছিল বরাবরই সাধারণ। রূপালি পর্দার ঝলমলে দুনিয়ার বাইরেও তিনি ছিলেন অনেকটাই নিভৃতচারী।
নানা পাটেকরের মানবিক কর্মকাণ্ডের কথাও বহুবার সামনে এসেছে। মহারাষ্ট্রের লাতুরের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে দুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহায়তা, বন্যাকবলিতদের জন্য ত্রাণ-বিভিন্ন সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘নাম ফাউন্ডেশন’ও কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে কাজ করে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নানা পাটেকর নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন। এমনকি শোনা যায়, তার আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই বিভিন্নভাবে দান করে দিতেন তিনি। অর্থ-সম্পদের প্রতি অনুরাগের বদলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোতেই যেন বেশি তৃপ্তি খুঁজে নিতেন এই অভিনেতা।
ব্যক্তিজীবনেও তার সেই সরলতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকার সময়ও মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে একটি এক কামরার ফ্ল্যাটে মায়ের সঙ্গে থাকতেন নানা। কয়েক দশক আগে প্রায় ৭৫০ বর্গফুটের ওই ফ্ল্যাটটি প্রায় ১ দশমিক ১ লাখ রুপিতে কিনেছিলেন বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন সেখানেই কাটিয়েছেন তিনি।
সবুজের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ছিল নানার। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন। তাই পুনেতে গড়ে তোলেন প্রায় ২৭ একর জমির একটি ফার্মহাউস। সুযোগ পেলেই সেখানে নিজের হাতে চাষাবাদ করতেন। সেই ফার্মহাউসের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল স্থানীয় মানুষের জীবিকা। সেখান থেকে পাওয়া আয়ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জীবনের শেষদিকে গোয়ার ডোনা পাউলায় একটি বড় বাড়িও কিনেছিলেন নানা পাটেকর। সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও জায়গাটি ছিল শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে। শেষ সময়ে মুম্বাই, পুনে ও গোয়ার বাড়ির মধ্যে সময় ভাগ করে নিতেন তিনি। তবে পুনের ফার্মহাউসে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করতেন বলে জানা যায়।
অভিনয়ের সুবাদে বিপুল অর্থ উপার্জন করলেও নানার সম্পদের পরিমাণ তার জনপ্রিয়তার তুলনায় খুব বেশি ছিল না বলেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যারিয়ারের শেষ দিকেও ছবিপ্রতি প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি রুপি পারিশ্রমিক পেতেন তিনি। মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাট, পুনের ফার্মহাউস ও গোয়ার বাড়িসহ তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ কোটি রুপি বলে জানা যায়।
তার জীবনযাপনের সরলতার আরেকটি উদাহরণ ছিল গাড়ির সংখ্যাও। এত বড় মাপের অভিনেতা হয়েও তার মালিকানায় ছিল মাত্র তিনটি গাড়ি। সেগুলোর কোনোটিই ছিল না অতিমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি।
তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চারবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত নানা পাটেকর জীবনের শেষ দিনগুলোও কাটিয়েছেন অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে।
যে মানুষটি সারাজীবন খ্যাতি ও গ্ল্যামারের চেয়ে সাধারণ জীবন আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তার জীবনযাপনের সেই সরলতাই শেষ পর্যন্ত তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে।
নানার প্রয়াণে বলিউড ও অভিনয়জগতে যেমন শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তেমনি শোকাহত মহারাষ্ট্রসহ দেশের অসংখ্য মানুষ। অভিনয়ের জন্য পাওয়া স্বীকৃতির পাশাপাশি মানুষের জন্য নীরবে কাজ করে যাওয়া এই অভিনেতার মানবিক পরিচয়ও তাই তার ভক্তদের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
0 মন্তব্য