রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) সদস্যপদ লাভ, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ।
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও বহুমাত্রিক করার লক্ষ্যে ওয়েলিংটনে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে এ সমর্থন চেয়েছে ঢাকা।
বৈঠকে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির বাণিজ্য আলোচনা ও নীতি বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক সারা মেম্যান্ড এবং ইউনিট ব্যবস্থাপক জোনাস হোল্যান্ড।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছাড়াও ওয়েলিংটনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর ইশতিয়াক আহমেদ ছিলেন।
বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ সরকার ও বাণিজ্যমন্ত্রীর শুভেচ্ছা নিউজিল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন তারা।
দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপ দিতে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখাও তুলে ধরে বাংলাদেশ।
বৈঠকে গুরুত্ব পায় আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের বিষয়টি। বাংলাদেশ জানায়, আরসিইপি সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলির বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কাঠামোকে আরসিইপির উচ্চমানের বাণিজ্যবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এসব সংস্কারের মধ্যে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানোর উদ্যোগ, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও সরবরাহব্যবস্থা খাত আরও উন্মুক্ত করতে ‘ইতিবাচক তালিকা’ থেকে ‘নেতিবাচক তালিকা’ পদ্ধতিতে রূপান্তর এবং প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও তথ্য সুরক্ষায় আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের বিষয় রয়েছে।
আরসিইপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ডের নীতিগত প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ দেশটির সক্রিয় সমর্থন চায়। পাশাপাশি আরসিইপির আওতায় সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাতের সুরক্ষায় আসিয়ানের স্বল্পোন্নত দেশের সদস্যদের মতো ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক ছাড়ের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়সীমার পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণকাল বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে করা বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি উন্নয়নশীল এবং উত্তরণপ্রক্রিয়ায় থাকা অর্থনীতিগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের চলমান আর্থ-সামাজিক রূপান্তর, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ জানায়, এলডিসি উত্তরণ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিলম্বিত করার কোনো অভিপ্রায় নেই। অতিরিক্ত সময়কে টেকসই ও সুসংগঠিত জাতীয় প্রস্তুতি বাস্তবায়নের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির জন্য কার্যকর ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪তম মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলন (এমসি-১৪) সামনে রেখে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
প্রস্তাবিত এফটিএ বাস্তবায়িত হলে নিউজিল্যান্ডের জন্য বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের ভোক্তা বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষিযন্ত্র ও ধাতব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পণ্য ও সেবার জন্য এলডিসি উত্তরণের পর নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি এফটিএ দুই দেশের বাণিজ্যকে বর্তমান পর্যায় থেকে নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও গতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে বাংলাদেশ তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়।
প্রথমত, আরসিইপিতে এলডিসি-পরবর্তী বাজার সুবিধা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য একটি বার্ষিক ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গোষ্ঠী’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, এফটিএ আলোচনার প্রথম ধাপ হিসেবে দুই দেশের সমন্বয়ে একটি যৌথ কার্যদল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের আবেদনের প্রতি সমর্থন নিশ্চিত করতে নিউইয়র্কে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আশা প্রকাশ করে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা পাবে।
বৈঠকে উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে নিয়মিত যোগাযোগ ও উচ্চপর্যায়ের নীতি-সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল শিগগিরই নিউজিল্যান্ডের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানায়। নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ এতে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে।
0 মন্তব্য