দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত।
বুধবার (৭ অক্টোবর) শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান আপসের শর্তে গাজী নজরুলের জামিন আবেদন করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জামিনের বিরোধিতা করা হয়।
এদিন মামলার বাদী ও মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আদালতে আপসনামা দাখিল করে গাজী নজরুলের জামিনে তার কোনো আপত্তি নেই বলে জানান। তবে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
মামলার বাদী আদালতকে জানান, মরিয়মের আত্মহত্যার ঘটনায় গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে সন্দেহের বশে আসামি করা হয়েছে।
যেভাবে শুরু হয় মামলা
এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত জুনে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। সংসদ সদস্য হওয়ায় গাজী নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ও মরিয়ম ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।
বাদীর অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনে তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, বাসার একটি কক্ষে মরিয়ম ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছেন। পরে পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় বিছানার ওপর মরিয়মের লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায় বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মরিয়মের বাবার অভিযোগ, আসামিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং তাদের প্ররোচনায় তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
আসামিদের রিমান্ড ও জামিন
মামলায় গ্রেপ্তারের পর গত ২১ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে ২২ সেপ্টেম্বর মাকসুদাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
২৩ সেপ্টেম্বর মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়। চার দিনের রিমান্ড শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুল ইসলামকে আরও চার দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর মাকসুদা ইসলাম জামিন পান।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বহিষ্কার
এর আগে গত জুলাইয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গত ২১ জুলাই গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম হাইকোর্ট থেকে গত ১০ আগস্ট আট সপ্তাহের জামিন পান।
পরে ওই মামলার বাদী ওবায়দুর রহমানকেই মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় আসামি করা হয়।
বর্তমানে মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ায় তিনি কারাগারেই থাকছেন।
0 মন্তব্য