জলবায়ু সহনশীলতা তৈরিতে অংশীদারি, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও যৌথ অঙ্গীকারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি তহবিলকে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে আনা, জলবায়ু অর্থায়নকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আরো সহজলভ্য করা এবং পাশাপাশি সবুজ জলবায়ু তহবিলকে কার্যকর করা প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রশমনের পাশাপাশি অভিযোজনও অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টায় চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের তালিয়ান শহরের তালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে এক সেশনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘সামার দাভোস’-এ ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট জলবায়ু নেতৃত্ব’ শীর্ষক এই সেশনের আয়োজন করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। এর আগে সম্মেলনস্থলে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি।
চীনের তালিয়ান শহরে গতকাল শুরু হয় বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘সামার দাভোস’।
শেষ হবে ২৫ জুন। ‘বৃহৎ পরিসরে উদ্ভাবন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এবারের সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থনীতি, শিল্পকাঠামোর পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উদীয়মান প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ, চীনের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও এর বিস্তৃত অর্থনৈতিক সুফলের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান কমানোর বিষয়টি এবারের সম্মেলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পায়। এবারের সম্মেলনে ৯০টিরও বেশি দেশের প্রায় এক হাজার সাত শর অধিক সরকারি প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করেছেন।
এদিকে চীনের স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তালিয়ানের সাংগ্রি-লা হোটেলে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সফরের বিভিন্ন কর্মসূচি, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বিস্তারিত তুলে ধরেন।
মাহদী আমিন বলেন, ‘সমতা, ন্যায্যতা ও ভারসাম্যের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত সোমবার রাতে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে আমরা চীনের তালিয়ান আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছি।
মালয়েশিয়া থেকে চীনের তালিয়ানে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে আমরা ২১ সদস্যের সংক্ষিপ্ত একটি প্রতিনিধিদল এসেছি। যেখানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার আটজন রয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দেশে যেমন জনগণের আস্থা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে গৃহীত হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর কর্মযজ্ঞের ফলে দীর্ঘদিন পর বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন একজন স্টেটসম্যান, যিনি সমতা, ন্যায্যতা ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে কার্যকরভাবে ধারণ করছেন, নিশ্চিত করছেন বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান।
তালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোসে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের বেস্ট প্র্যাকটিস গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতাকে আরো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করছে বলেও উল্লেখ করেন মাহদী আমিন।
তিনি আরো বলেন, ‘অত্যন্ত সফল মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী মাত্র কয়েক কর্মঘণ্টা পেলেও তার মাঝেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও মহামান্য রাজাসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় চীনে এসে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে বর্তমানে বহুপক্ষীয় বিষয় নিয়ে উপস্থিত বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু করেছেন।’
চীনে সংবর্ধনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয় বিষয়ে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে চলেছেন। চীন সরকারের একটি উচ্চ প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করেন এবং মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে হোটেলে নিয়ে আসে। রাস্তাজুড়েই ছিল রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও পুলিশি প্রহরা। এই সম্মাননার জন্য চীন সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।’
সামার দাভোস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, “তারেক রহমান একজন সরকারপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের বাইরে এটিই প্রথম কোনো বৈশ্বিক সম্মেলনে যোগদান। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে অধিকতর বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অংশীদারির সঙ্গে আরো গভীরভাবে সংযুক্ত করা। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’ বার্তার মাধ্যমে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আস্থাশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।”
তারেক রহমান ও আলোইস জুইংগির মধ্যে সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জুইংগির মধ্যে একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার কিভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে, দেশের মানুষকে অগ্রযাত্রার পথে ধাবিত করতে পারবে, সেগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রশংসা করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ নামক সেশনে বক্তব্য দেন। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচিত সরকার কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে, প্রশংসিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি কর্মসূচিগুলো বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করেন।
বিশ্বনেতাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনঃখনন, পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, সবুজশিল্পের বিকাশে পাটশিল্প ও পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ভেহিকল চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়; এটি আমাদের সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ।’
প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন, সহজলভ্য ও পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং প্রশমন ও অভিযোজন কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন।
লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে একটি নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশগ্রহণ করছেন। সেখানে বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সিওক, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম-ওসোরিন উচরাল, গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু ওউরি বাহ, মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোজকো স্পাজিচ, কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকটেনভের সঙ্গে (সাত দেশের সরকারপ্রধান) একসঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভোজ এবং উন্মুক্ত আলাপচারিতায় অংশ নেন।
‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্সে’ যোগদান
আজ সকালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অন্যান্য বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক পলিসি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবেন। তালিয়ান থেকে বেইজিংয়ে একটি হাই স্পিড ট্রেনের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের উদ্দেশে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফর সঙ্গীরা স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন।
আগামীকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
তালিয়ান থেকে আজ বুধবার বেইজিং পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে অংশ নেবেন। প্রায় এক শ চীনা বিনিয়োগকারী ও ব্যাবসায়িক নেতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠেয় এই ফোরামে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে। পরদিন বৃহস্পতিবার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১০টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ও বিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক কৌশলগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
0 মন্তব্য