মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ইরান জাতিসংঘের পারমাণবিক পরিদর্শকদের দেশটিতে প্রবেশ করতে দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হওয়ার পর, সোমবার ইরানের তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সুইজারল্যান্ডের বিলাসবহুল বার্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি সফল চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আমরা খুব ভালো ভিত্তি তৈরি করেছি।’
সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, ‘পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। তবে বিস্তারিত কোনো আলোচনা হয়নি।’
ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী এখন ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’।
যুদ্ধের শুরুতে ইরান এ জলপথ বন্ধ করে দিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরণের ধাক্কা লাগে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আলোচনা করছি। দেখা যাক কী হয়। তবে আমাদের হাতে দুটি বিষয় আছে। একটি হলো উন্মুক্ত প্রণালী, আর অন্যটি হলো এমন একটি দেশ, যা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।’
প্রায় ৪০ দিনের সংঘাত ও তার পরবর্তী নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির পর গত সপ্তাহে তেহরান ও ওয়াশিংটন একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। এর ভিত্তিতেই সুইজারল্যান্ডে বর্তমান আলোচনা শুরু হয়।
দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, এসব আলোচনার মূল বিষয়।
ভ্যান্স বলেন, ‘চূড়ান্ত চুক্তি হচ্ছে একটি বাড়ির মতো। আমরা এখনো বাড়ি তৈরি করিনি। তবে ভালো একটি জায়গায় পৌঁছানোর জন্য সফল ভিত্তি তৈরি করেছি, যা আমেরিকান জনগণের জন্য ইতিবাচক হবে।’
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানকে অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের সুযোগ দিতে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, হরমুজ প্রণালীতে ‘অবাধ ও উন্মুক্ত চলাচল’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের ইরানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
- ‘ট্রাম্পের ধ্রুপদি চুক্তি’-
ভ্যান্স বলেন, তেহরান আইএইএ পরিদর্শকদের দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে।
তিনি এটিকে ‘একটি বড় মাইলফলক’ ও ইরানকে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার ‘প্রথম ধাপ’ বলে উল্লেখ করেন।
২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আইএইএ’র প্রবেশ বন্ধ করে দেয় তেহরান এবং সংস্থাটির সঙ্গে কিছু সহযোগিতাও স্থগিত করে।
গত নভেম্বরের পর থেকে পরিদর্শকরা ইরান সফর করতে পারেননি।
ভ্যান্স বলেন, চুক্তির অংশ হিসেবে এখনো ইরানের কোনো সম্পদ অবমুক্ত করা হয়নি। ভবিষ্যতে তা করা হলে সেই অর্থ সয়াবিনের মতো মার্কিন পণ্য কিনতে ব্যবহার হবে, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের জন্য নয়।
তিনি বলেন, ‘এটি ট্রাম্পের ধ্রুপদি ধরণের চুক্তি। যদি কখনো ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করা হয়, তাহলে তা আমেরিকান কৃষকদের আরও সমৃদ্ধ করবে ও ইরানের জনগণের খাদ্য যোগাবে।’
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর ছাড় দেওয়া হয়েছে, অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে, কিছু জব্দ সম্পদ অবমুক্ত করা হয়েছে এবং ইরানের জন্য বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফরে যাচ্ছেন।
তার মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, সফরে তিনি চুক্তি এবং ‘হরমুজ প্রণালীতে পূর্ণ, অবাধ ও নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা’ নিয়ে আলোচনা করবেন।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকরা ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি ‘রোডম্যাপ’-এ সম্মত হয়েছেন।
সপ্তাহের বাকি সময়জুড়ে সুইস রিসোর্টে কৌশলগত পর্যায়ের আলোচনা চলবে।
দুই দেশ জানায়, ‘উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতি’ হয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে ‘ঘটনা ও ভুল বোঝাবুঝি’ এড়াতে একটি যোগাযোগ চ্যানেলও চালু করা হয়েছে।
-লেবানন-
সংঘাত শুরুর আগে প্রণালীটিতে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল অবাধ ছিল। তবে যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে তেহরান এ জলপথ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
সোমবারের জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রণালীটি দিয়ে এখনো জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে। যদিও শনিবার লেবাননে ইসরাইলি হামলার জেরে ইরান আবারও জলপথটি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার আগে ও চলাকালে লেবাননে ইসরাইল ও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
তবে শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে দেশটিতে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত রয়েছে।
পুনরায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও লেবাননের কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠনের বিষয়ে সম্মতি হয়েছে।
তবে চুক্তি নিয়ে ইসরাইলি নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সোমবার বলেন, দক্ষিণ লেবাননে ‘সরাসরি বা সম্ভাব্য যে কোনো হুমকি প্রতিহত করতে’ ইসরাইলি বাহিনীর পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে চলমান সংঘাতে নিহতের সংখ্যা এখন ৪ হাজার ১০০ ছাড়িয়েছে।
0 মন্তব্য