মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচলে নতুন করে হামলার ঘটনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে।
বুধবার রাতারাতি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে পৌঁছেছে। গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) রাত ৩টায় অক্টোবর ডেলিভারির জন্য ব্রেন্ট ফিউচারসের দাম ছিল ৮৯ দশমিক ৬১ ডলার। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় দামটি প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, বাজার এখনো চুক্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেনি। তবে এ বিষয়ে আস্থা স্পষ্টভাবেই কমছে। আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়াই যত বেশি সময় পার হচ্ছে এবং দাবিগুলো যত জটিল হচ্ছে, দ্রুত কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে সংশয়ও তত বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে চলতি সপ্তাহে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী সংকেত।
মঙ্গলবার ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার অভিযোগ করেছে, ইরানপন্থী হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করেছে। আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলকে বিভক্ত করা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হামলার পর উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্যও নিহত হন বলে জানিয়েছে ইয়েমেনের কোস্টগার্ড।
এদিকে একই দিন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করায় পানামার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজে হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করে দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। তবে বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে আলোচনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে এবং দোহা যত দ্রুত সম্ভব নৌপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার পক্ষে।
তবে ইরান জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে তাদের আলোচনা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয় থেকে আলাদা। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি বন্ধ থাকবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ওয়াশিংটনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে সোমবার মাত্র ১০টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড।
তেলের বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমোডিটি কনটেক্সটের হিসাবে, গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের দৈনিক গড় সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেলে উঠেছিল।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্বাভাসে যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন ২০২৭ সালের শুরুর আগে সংঘাত-পূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি ফিরবে না। সংস্থাটি ২০২৬ সালে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৭ ডলার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহ বলেন, হরমুজ প্রণালিতে উভয় দিকের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ওপেকের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকবে। ফলে কূটনৈতিক আলোচনায় নতুন করে ইতিবাচক অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে।
সূ্ত্র:আল জাজিরা
0 মন্তব্য