বুধবার কোরীয় উপদ্বীপের পূর্ব উপকূলের সাগর অভিমুখে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে উত্তর কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। সিউল ও ওয়াশিংটনের বড় ধরনের যৌথ সামরিক মহড়ার কয়েক দিন আগে এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করল পিয়ংইয়ং। দীর্ঘদিন ধরেই এই মহড়ার বিরোধিতা করে আসছে উত্তর কোরিয়া।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ (জেসিএস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ৬টার দিকে উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলের ওয়ানসান এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এর ছয় দিন আগে একই এলাকা থেকে আরও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছিল পিয়ংইয়ং।
আগামী ১৭ থেকে ২৭ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নামে যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র সক্ষমতা মোকাবিলায় এই মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে।
সিউলের কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিন বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণটি উত্তর কোরিয়ার চলমান অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হতে পারে। তবে মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়ার আগে বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেও এর সময় নির্ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো অস্ত্র পরীক্ষামূলকভাবে উন্নয়নের অংশ হলেও সেটি কখন উৎক্ষেপণ করা হবে, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ৬ আগস্টও ওয়ানসান থেকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল উত্তর কোরিয়া। তবে সেই উৎক্ষেপণের খবর দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। গবেষক হং মিনের ধারণা, ওই পরীক্ষা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে থাকতে পারে।
চলতি বছর উত্তর কোরিয়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আর্টিলারি রকেট ও অন্যান্য কৌশলগত অস্ত্র রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার হিসাব অনুযায়ী, বুধবারের উৎক্ষেপণটি ২০২৬ সালে উত্তর কোরিয়ার ১১তম সন্দেহভাজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা।
দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৭০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। তবে বুধবারের ক্ষেপণাস্ত্রটিকে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেনি দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ। এর বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা, গতিপথ ও উৎক্ষেপণস্থল বিবেচনায় এটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের কোনো ধরনের সংস্করণ হতে পারে। তবে সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত ৩০০ থেকে ১ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
এদিকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান উভয় দেশই এই উৎক্ষেপণের নিন্দা জানিয়েছে। জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেন, বেইজিংয়ে জাপানি দূতাবাসের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং এই কর্মকাণ্ডের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে টোকিও।
এর আগে মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জাপানের সর্বশেষ প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রের সমালোচনা করে। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উত্তর কোরিয়াকে উপস্থাপন করে জাপান সামরিক শক্তি বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তৈরি করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা কার্যালয় জরুরি বৈঠক করে উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব লঙ্ঘন করে এমন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিউল।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় যেকোনো ধরনের উসকানির জবাব দিতে তারা ‘প্রবলভাবে’ প্রস্তুত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড জানিয়েছে, তারা মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনা করছে। তাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্য, ভূখণ্ড কিংবা মিত্রদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি তৈরি করেনি।
এদিকে মঙ্গলবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়ায় একটি ইস্পাত কারখানায় রাশিয়ার হামলায় উত্তর কোরিয়ার তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ওই হামলায় কারখানাটির সাতজন শ্রমিক নিহত হন বলে জানান তিনি।
0 মন্তব্য