বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফি তৈরি, সংরক্ষণ, বিতরণ ও প্রচার আইনত এবং সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ গোপনে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারে জড়িত হচ্ছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের একাধিক অভিযানে এমনই অভিযোগ সামনে এসেছে। ঢাকা, নোয়াখালী, বান্দরবান ও গাইবান্ধায় কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, পর্নোগ্রাফিক ভিডিও তৈরির অভিযোগে নারী-পুরুষের একটি দল, পরিবারের একাধিক সদস্য এবং এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছয়টি অভিযানে অন্তত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় কোথাও অর্থের বিনিময়ে ভিডিও তৈরির অভিযোগ, তো কোথাও চাকরির প্রলোভনে তরুণীদের ডেকে এনে আটকে রেখে কনটেন্ট তৈরি, আবার কোথাও অনলাইনে কনটেন্ট প্রকাশ করে অর্থ উপার্জনের মতো উদ্বেগজনক চিত্রও দেখা গেছে।
সম্প্রতি আলোচিত কয়েকটি ঘটনা : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি, প্রচার ও বিক্রির অভিযোগে এক ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার সুমাইয়া সাঈদ ও তাঁর সহযোগী খাজা সাকলাইন ফারুককে গত ১১ আগস্ট রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের ঘটনা আলোচনায় আসে। ডিবির তথ্য অনুযায়ী, সুমাইয়া ও ফারুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কনটেন্ট প্রচার এবং টেলিগ্রামভিত্তিক গ্রুপ/চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে তা সরবরাহ করতেন। এমনকি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে দেওয়া হতো ‘লাইফটাইম প্যাকেজ’ও। এ ছাড়া গত ৬ আগস্ট নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের করিমপুর এলাকায় একটি আবাসিক ভবন থেকে স্বামী-স্ত্রী, তাঁদের দুই ছেলে এবং আরো একজনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, ওই বাসায় পর্নোগ্রাফিক ভিডিও তৈরির কার্যক্রম চলছিল। অভিযানে চার তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া এক তরুণী গোপনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে সাহায্য চান। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়, এক তরুণীকে পার্লারে চাকরির আশ্বাস দিয়ে চৌমুহনীতে আনা হয়। পরে তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে একটি বাসায় তাঁকে আটকে রাখা হয়। এরপর জোরপূর্বক পর্নোগ্রাফিক ভিডিও ধারণ করা হয়। সেসব ভিডিও অনলাইনে প্রকাশ করে অর্থ উপার্জন করা হতো।
এ ছাড়া ৩১ জুলাই রাতে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহরের একটি ভাড়া বাসায় পর্নোগ্রাফিক ভিডিও তৈরির অভিযোগে দুই নারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুই নারী ভিডিও ধারণে অংশ নিচ্ছিলেন এবং দুই পুরুষ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছিলেন। অভিযানে জব্দ করা হয় পর্নোগ্রাফি তৈরির সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ।
গত ২৬ এপ্রিল রাতে রাজধানীর মিরপুরে পর্নোগ্রাফি বিক্রি ও সরবরাহের অভিযোগে জাহিদ হোসেন (২১) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।
এর আগে গত বছরের ২০ অক্টোবর পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের অভিযোগে বান্দরবান শহরের মধ্যমপাড়া এলাকা থেকে বৃষ্টি ও আজিম নামের এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিআইডি জানায়, ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা এবং আন্তর্জাতিক অ্যাডাল্ট ওয়েবসাইটে আপলোডের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে নতুন নির্মাতা নিয়োগের প্রচারের অভিযোগও উঠে আসে তাঁদের বিরুদ্ধে। একই বছর ৩০ এপ্রিল রাতে রাজধানীর একটি বাসায় ‘ফেমডম সেশন’-এর নামে পুরুষদের শারীরিকভাবে নির্যাতন এবং সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ ও প্রচারের অভিযোগে শিখা আক্তার (২৫) ও সুইটি আক্তার জারা (২৫) নামের দুই নারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ডিজিটাল ফরেনসিকের ভূমিকা : এ ধরনের মামলায় জব্দ করা মোবাইল, ক্যামেরা, কম্পিউটার, রাউটার ও অন্যান্য ডিভাইস গুরুত্বপূর্ণ আলামত। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে ভিডিও বা ছবি কখন তৈরি হয়েছে, কোন ডিভাইসে সংরক্ষিত হয়েছে, কোথায় পাঠানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অনলাইন অ্যাকাউন্টের সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ ছিল এসব বিষয়ে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এ কারণে শুধু ঘটনাস্থল থেকে ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করাই তদন্তের শেষ ধাপ নয়; ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
আইন কী বলছে : বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১২ সালে আইন করা হয়। পাশাপাশি কোনো ঘটনায় প্রতারণা, জবরদস্তি, আটক, শারীরিক নির্যাতন বা মানবপাচারের উপাদান থাকলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনও বিবেচনায় আসতে পারে। এ ধরনের মামলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইনে ভিডিও ছড়ানো ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ : ঘটনাস্থল থেকে ভিডিও তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা সম্ভব হলেও অনলাইনে একবার কোনো কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়লে সেটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। মূল অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও মুছে ফেলা হলেও অন্য কেউ সেটি ডাউনলোড করে পুনরায় প্রকাশ করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, পর্নোগ্রাফি তৈরির অভিযোগ এখন শুধু কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটির সঙ্গে অনলাইন অর্থনীতি, কোথাও প্রতারণা, কোথাও জবরদস্তি বা শোষণের অভিযোগও যুক্ত হচ্ছে।
নজরদারি বাড়লেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে : দেশের বিভিন্ন এলাকায় পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরির অভিযোগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তৃতি এবং দ্রুত কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতার কারণে শুধু ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে সমস্যাটির পুরোপুরি সমাধান করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ডিজিটাল সচেতনতা, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং অনলাইনে অবৈধ কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
টাঙ্গাইলের মাওলানা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী জড়িতদের গ্রেপ্তার করছে। তবে প্রকৃতপক্ষে অপরাধীদের সংখ্যাটা অনেক বেশি। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি, ডিজিটাল মনিটরিং বাড়িয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি, প্রচার, বিজ্ঞাপন, বিক্রি কিংবা এসব অপরাধে সহযোগিতার বিরুদ্ধে ডিএমপি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধের তথ্য পেলে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে জানানোর অনুরোধও করেন।’
0 মন্তব্য