চিত্রনায়িকা তমা মির্জার এবি ব্যাংকে যোগদানের খবর সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত ও বিনোদন অঙ্গনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনার ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়েছে ২০২১ সালের বহুল আলোচিত পরীমনি-‘মাসরুর’ প্রসঙ্গেও।
এ আলোচনায় সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের নাম আবারও নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে। তবে পরীমনিকে বিলাসবহুল গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগ তিনি শুরু থেকেই স্পষ্টত অস্বীকার করে আসছেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত কিছু দাবি এবং গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে, পরীমনির গাড়ি বিতর্কে আলোচিত ‘মাসরুর’ আসলে মাসরুর আরেফিন নন; বরং তিনি খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু। খন্দকার মাসরুর সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে এবং শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী।
এই সূত্র অনুযায়ী, বোট ক্লাব কাণ্ডের পর পরীমনিকে দামি গাড়ি উপহার দেওয়া নিয়ে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনের মন্তব্যে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর নামের ইঙ্গিত ছিল। সাংবাদিকদের সামনে এই রাজনৈতিক ভুলটি করার পরপরই ডিবি কর্মকর্তা হারুন মাসরুর হোসেন নামটি আড়াল করতে সিটি ব্যাংকের মাসরুর আরেফিনের নামটি সামনে নিয়ে আসেন। সে সময় তৎকালীন সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের ভাই শওকত আজিজ রাসেলের সঙ্গে হারুনের বিবাদ তুঙ্গে।
সূত্র বলছে, হারুন এখানে একই সঙ্গে দুটি কাজ করেছিলেন খন্দকার মাসরুর হোসেনকে আড়াল করা এবং এতে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনকে জড়ানোর মাধ্যমে এই ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া।
ঘটনার কিছুদিন আগে দুবাইয়ে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর সঙ্গে পরীমনির সাক্ষাতের বিষয়ে নানা আলোচনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছিল। এই ঘটনা জানাজানির পর সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও খন্দকার মাসরুরের মধ্যে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়, যার জের ধরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদও হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ওই বক্তব্যের সত্যতা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
পরবর্তী সময়ে পরীমনিকে মামলা ও অন্যান্য আইনি জটিলতায় রাখার পেছনেও প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। এসবের মূল কথা হলো—খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুকে, অর্থাৎ হাসিনাকন্যা পুতুলের স্বামীকে দূরে রাখতে গিয়ে একই নামের কারণে মাসরুর আরেফিনকে অসম্মান ও অভিযোগের মুখে ফেলা হয়।
পরীমনিকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা দামের মাসেরাতি গাড়ি উপহার দেওয়ার গুঞ্জনে তাই ২০২১ সালের আগস্টে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিনের নাম প্রচার হয়। ওই সময় প্রকাশিত সংবাদে তাঁর সঙ্গে পরীমনির কথিত অডিও রেকর্ডে গাড়ি উপহারের প্রসঙ্গ থাকার দাবি করা হয়। দৈনিক ইত্তেফাকের একই প্রতিবেদনে সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরীমনির ঘনিষ্ঠতার কথাও উল্লেখ করা হয়।
এমন সংবাদ প্রকাশের পরপরই মাসরুর আরেফিন অভিযোগটি অস্বীকার করেন। তিনি সেই সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, পরীমনি নামের কাউকে তিনি কখনো দেখেননি, তার সঙ্গে কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ নেই এবং তার ফোন নম্বরও তাঁর কাছে থাকার প্রশ্ন আসে না। মাসরুর আরেফিন তখন বলেন, তাঁর জীবনের বড় অংশ ব্যাংকিংয়ের কাজ এবং সাহিত্যচর্চায় কাটে। তিনি কোনো ক্লাব বা পার্টিতে যান না বলেও দাবি করেন।
মাসরুর আরেফিনের পোস্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল সংবাদে ব্যবহৃত ব্যাংক চেয়ারম্যানের নাম। তিনি বলেন, ‘শওকত রুবেল’ নামে সিটি ব্যাংকের কোনো চেয়ারম্যান নেই। ব্যাংক চেয়ারম্যানের পরিচয় পর্যন্ত ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকলে একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে তোলা গাড়ি উপহারের অভিযোগ কোন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে করা হয়েছিল, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় ২৪ আগস্ট ২০২১ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় ভুল স্বীকার করে সংবাদ ছাপে, যেখানে বলা হয় : “প্রকাশিত সংবাদের এক স্থানে ভুলবশত একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের নাম ছাপা হয়েছে। এ ছাড়া এই সংবাদে একই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নাম ছাপা হয়েছে। এ কথা স্বীকার করতে কার্পণ্য নেই যে, এ দুটি তথ্যই ভুল ছিল। পরীমনির ঘটনার সঙ্গে মাসরুর আরেফিনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তাঁর নামটি ভুলবশত ছাপা হওয়ায় এবং তাতে করে তাঁর ব্যক্তিমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ায় ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করছে। সিটি ব্যাংকের এমডির মর্যাদাহানির বিষয়টি ইত্তেফাক গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং এই অনভিপ্রেত ভুলের জন্য তাঁর ও তাঁর পরিবারের কাছে আবারও দুঃখ প্রকাশ করছে।”
পরীমনির গাড়ি বিতর্কে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নামের বিভ্রান্তি। সূত্র বলছে, ওই মাসরুর আসলে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু।
0 মন্তব্য