যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ইরানে আরও হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এক মাসের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে প্রথমবারের মতো পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে মূলত অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকা সংঘাত আবারও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
ইরানের লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে রাতভর জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র-মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ সময় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের কঠোরভাবে আঘাত করতে যাচ্ছি। এর জবাব দেওয়া হবে।’
একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, রাতের পাল্টাপাল্টি হামলা ছিল ‘সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত সংঘাত’। তবে ইরানে আবার হামলা হলে তেহরান কঠোর জবাব দেবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের ছোড়া যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষয়ক্ষতি করতে পারত, সেগুলো সবই মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে। ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে বলেও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প।
এর আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওতে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপে ব্যাপক বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা যায় বলে দাবি করা হয়। তবে ভিডিও দুটি ছিল এআই দিয়ে তৈরি এবং সেখানে কোনো বাস্তব হামলার দৃশ্য দেখানো হয়নি। ইরান ট্রাম্পের পোস্টকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ট্রাম্প ‘একটি বার্তা দিচ্ছেন’।
এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস অবকাঠামোয় হামলা চালানো থেকে বিরত রয়েছে। তেহরান সতর্ক করে বলেছে, এসব স্থাপনায় হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালানো হতে পারে।
সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন গত এক মাসে সংঘাত মূলত অর্থনৈতিক চাপের দিকে মোড় নিয়েছিল। উভয় পক্ষই একে অপরকে পিছু হটতে বাধ্য করতে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করেছে।
অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটন ইরানের তেল বাণিজ্য এবং দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি সামরিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
উত্তর ক্যারোলিনায় জি-২০ বৈঠকের ফাঁকে সাংবাদিকদের বেসেন্ট বলেন, ‘তাদের অর্থনীতির অবস্থা দেখে তারা হতবাক।’
এর আগে রোববার বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিতভাবে ইরানের ওপর নতুন করে ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। শুরুতে এসব নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য থাকবে ব্যাংকগুলো।
লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা
রোববার লারাক দ্বীপে ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থায় হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। এক মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র-মাইন বহনকারী রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনীর দুই সদস্যও রয়েছেন।
ইরানের বন্দর আব্বাসের কাছে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত লারাক দ্বীপ। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত এই জলপথ অবরুদ্ধ রয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ‘আসন্ন হুমকি’ সৃষ্টি করা ইরানি মাইন স্থাপনকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘সীমিত ও সুনির্দিষ্ট’ অভিযান চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, প্রণালির দক্ষিণ অংশে দুটি নৌ-মাইনের আঘাতে একটি সুপারট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই দাবি অস্বীকার করেছে।
আলোচনায় ফিরতে চায় ইরান
এপ্রিল মাসে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ব্যাপক বোমা হামলা অভিযান বন্ধ করেন ট্রাম্প। এরপর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ। জুনে পরবর্তী আলোচনার জন্য একটি অন্তর্বর্তী কাঠামোও তৈরি হয়েছিল। তবে সেটি ভেঙে যায় এবং জুলাইয়ে আবারও সংঘাত শুরু হয়। এর মধ্যে দুই সপ্তাহ ধরে ইরানে ব্যাপক মার্কিন বোমা হামলাও চালানো হয়।
জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ওপর বেশি নির্ভর করছে।
ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে এবং তেহরানের তত্ত্বাবধানেই কেবল এটি পুনরায় খুলবে।
জ্যেষ্ঠ ইরানি ওই কর্মকর্তা বলেছেন, তেহরানের নির্ধারিত নিয়ম মেনে না চলা জাহাজগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
তবে সোমবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান তুলনামূলক সমঝোতামূলক অবস্থান নিয়েছেন। কিরগিজস্তানে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বৈঠকের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, তেহরান এখনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায়।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিমের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ান বলেন, ‘যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কারও স্বার্থে নয়—আমাদের, এই অঞ্চলের কিংবা মানবতার কারও নয়।’
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প যে প্রধান লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলেন, সেগুলোর এখনো কোনোটি পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। এসব লক্ষ্যের মধ্যে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর হামলার সক্ষমতা সীমিত করা এবং ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দেশটির জনগণের চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।
তথ্যসূত্র: সামা টিভি
0 মন্তব্য