“আমার মেয়েও গেল, বাইশ লাখ টাকাও গেল—আমি সরকারের কাছে বিচার চাই।”
মাদারীপুর সদর উপজেলার কুনিয়া ইউনিয়নের আলগী গ্রামের কুটি বেপারীর ছেলে হালান বেপারীর এই আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।
পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে তার ছেলে হালান বেপারীকে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে বন্দি করে নির্যাতন করা হয়। সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পৌঁছানোর পর ঘটে আরও মর্মান্তিক ঘটনা—বাবার ওপর নির্যাতনের ভিডিও দেখে আত্মহত্যা করেন তার ১৯ বছর বয়সী কলেজপড়ুয়া মেয়ে শান্তা আক্তার বলে দাবি পরিবার ও এলাকাবাসীর।
পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে হালান বেপারীকে প্রথমে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে তাকে একটি বন্দিশালায় আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে হালানের ওপর নির্যাতনের একটি ভিডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়।
বাবার ওপর নির্যাতনের সেই ভিডিও দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তার ১৯ বছর বয়সী কলেজ ছাত্রী মেয়ে শান্তা আক্তার। পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, আত্মহত্যার আগে শান্তা একটি চিঠি লিখে যান।
চিঠিতে তিনি লেখেন—
“আমার বাবাকে আর মেরো না। আমার বাবাকে মুক্ত করে হয়তো দেশে পাঠাও, নয়তো ওখান থেকে ইতালি পাঠাও।”
এরপর শান্তা আত্মহত্যা করেন বলে দাবি করেছেন তার পরিবার ও এলাকাবাসী। তাদের দাবি, বাবার ওপর নির্যাতনের ভিডিও দেখার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েই এমন মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
হালানের পরিবারের অভিযোগ, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দফায় দফায় টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ২২ লাখ টাকা দেওয়ার পরও তাকে ইতালিতে পাঠানো হয়নি।
বরং লিবিয়ায় বন্দি অবস্থায় তাকে নির্যাতন করা হয় এবং মুক্ত করার কথা বলে আরও টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
পরবর্তীতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর হালানকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করেও ইতালিতে যেতে না পারায় পরিবারটি আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা ও একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, হালান বেপারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়ার ঘটনায় রেজাউল বেপারী, মামুন বেপারী ও রমজান বেপারীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মানবপাচার ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের দাবি, রেজাউল বেপারীর সঙ্গে ১১ লাখ টাকার চুক্তিতে হালান বেপারীকে ইতালিতে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ইতালিতে না পাঠিয়ে লিবিয়ায় আটকে রাখা হয় এবং পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু হালান বেপারীই নন—এই চক্রের মাধ্যমে আলগী গ্রামের আরও অনেক পরিবার বিদেশ যাওয়ার আশায় বিপুল টাকা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ভুক্তভোগী পরিবারের সংখ্যা শতাধিক।
এলাকাবাসী ও একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, হালান বেপারীর ঘটনার পর চাপের মুখে অভিযুক্ত রেজাউল বেপারী বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তাকে ফোনে না পেয়ে অনেক ভুক্তভোগী তার বাড়িতে গিয়েও তাকে খুঁজে পাননি বলে দাবি করেন।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, রেজাউল বেপারী অনুপস্থিত থাকায় তার স্ত্রী শারমিন বেগমের মাধ্যমে টাকা-পয়সার বিভিন্ন লেনদেন করা হতো।
স্থানীয়দের দাবি, রেজাউলকে ফোনে না পেয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী তার বাড়িতে যান। সেখানে রেজাউলকে না পেয়ে তার স্ত্রী শারমিন বেগমকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
রেজাউল বেপারীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন সাংবাদিকরা। রেজাউলের মা ও স্ত্রী শারমিন বেগম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, রেজাউল বেপারী মানবপাচারকারীদের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন।
ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। সাংবাদিকদের অর্থের বিনিময়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে সাংবাদিকরা কোনো ধরনের আর্থিক প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার, এলাকাবাসী এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সংগ্রহ করেন। হালান বেপারীর পরিবারের অভিযোগ ও স্থানীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি সামনে নিয়ে আসা হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ নেওয়া এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে আটকে রাখার ঘটনায় আলগী গ্রামের বহু পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শতাধিক পরিবার এই ধরনের প্রতারণা ও মানবপাচারের কারণে নিঃস্ব হয়েছে।
তাদের দাবি, বিষয়টি শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে বহু পরিবারের জীবন ও সঞ্চয় জড়িয়ে রয়েছে। তারা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, মানবপাচারের সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্ত করে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, হালান বেপারীর ঘটনা এবং তার মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি বিদেশে যাওয়ার নামে অর্থ নেওয়া এবং মানবপাচারের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
0 মন্তব্য