ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বুধবার অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর আওতায় অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোকে বিদেশে আটককেন্দ্র বা অস্থায়ী বন্দিশালা স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হবে।
সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থা কঠোর এবং এটি আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বিদ্যমান সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত গত এক দশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের উত্থান। এর ফলে বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনসমর্থনও বেড়েছে।
এই খসড়াটি কার্যকর হতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭টি সদস্য দেশের সরকারের চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন।
এটি ইইউর অভিবাসন নীতিকে কঠোর করার একটি পদক্ষেপ। ২০১৫-১৬ সালে ১০ লাখের বেশি শরণার্থী ও অভিবাসী ইউরোপে আসার পর থেকেই ইইউ ধীরে ধীরে কঠোর অভিবাসন নীতির দিকে এগোচ্ছে।
ব্রাসেলসে ইইউ নেতাদের বৈঠকের আগে মঙ্গলবার সদস্য দেশগুলোর উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেন, ‘প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত এই নতুন বিধিমালা দ্রুত ও আরো কার্যকর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজকে দক্ষ করে তুলবে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো বলছে, যাদের আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বা যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাদের নিজ নিজ দেশ বা অন্যত্র ফেরত পাঠানো এবং ইইউর ভূখণ্ড ত্যাগ নিশ্চিত করতে তারা বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
সমালোচকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি অভিবাসনের মূল কারণ। যেমন যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক নিপীড়ন সমাধানের পরিবর্তে অভিবাসীদের ঠেকানো এবং ফেরত পাঠানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সোমবার জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভলকার তুর্ক বলেন, ‘যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অভিবাসী ও শরণার্থীরা ভয়াবহ অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মৌলিক অধিকারও ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।’
সমালোচকদের মতে, অভিবাসী ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিয়মে আটকাদেশের ব্যবহার বাড়তে পারে, বিদেশে ফেরত পাঠানোর কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে বিদ্যমান সুরক্ষা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের যোগাযোগ আফগানদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হতে পারে। তবে এসব সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ইউরোপীয় কমিশন গত মাসে আফগান অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে তালেবান কর্মকর্তাদের ব্রাসেলসে আমন্ত্রণ জানায়।
ইউরোপীয় কমিশন এবং সফরের সহ-আয়োজক সুইডিশ সরকার বলেছে, এটি একটি কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক এবং এর মাধ্যমে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না।
রয়টার্সের দেখা একটি চিঠি অনুযায়ী, তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্দুল কাহের বলখির উদ্দেশে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ২২-২৩ জুনের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার বৈধ অধিকার নেই এমন আফগান নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠানো এবং তাদের পুনঃগ্রহণের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বুধবার জানান, তালেবান প্রতিনিধিদলের পাঁচ সদস্য ভিসার জন্য আবেদন করেছেন। তবে বৈঠকটি ঠিক কবে হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তিনি জানান, প্রতিনিধিদলের সদস্যদের নিরাপত্তা যাচাই-বাছাই করা হবে এবং কবে ভিসা দেওয়া সম্ভব হবে, সেটিও এখনও স্পষ্ট নয়। ইউরোপীয় কমিশন গত মাসে জানিয়েছিল, আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি কেবল তাদের ক্ষেত্রেই বিবেচনা করা হবে, যাদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। তবে ইউরোপীয় কমিশন বা সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী কেউই এখন পর্যন্ত বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত করেননি।
২০২১ সালে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো-সমর্থিত সরকারকে উৎখাত করে পুনরায় ক্ষমতায় আসে তালেবান। এরপর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
0 মন্তব্য