গোলরক্ষকের মূল দায়িত্ব প্রতিপক্ষের গোল ঠেকানো। কিন্তু সেই গোলরক্ষকই যদি প্রতিপক্ষের বক্সে গিয়ে গোল করে বসেন, সেটি নিঃসন্দেহে বিরল ঘটনা। আর এক ম্যাচে এমন গোল যদি হয় দুটি, তাহলে সেটি হয়ে ওঠে আরও বিস্ময়কর। ডাচ ফুটবলের শীর্ষ লিগ এরেডিভিসিতে এমনই এক কীর্তি গড়েছেন টেলস্টারের গোলরক্ষক রোনাল্ড কোম্যান জুনিয়র।
নামটি পরিচিত মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। তিনি ডাচ ফুটবল কিংবদন্তি ও নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের সাবেক কোচ রোনাল্ড কোম্যানের ছেলে। বাবা ছিলেন ডিফেন্ডার, কিন্তু গোল করার দক্ষতার জন্যও ছিলেন বিখ্যাত। এবার গোলরক্ষক হিসেবে মাঠে নেমে ছেলে যেন বাবাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন।
রোববার ক্যামবুরের বিপক্ষে এরেডিভিসির ম্যাচে কোম্যান জুনিয়রের জোড়া গোলে ২-২ ব্যবধানে ড্র করেছে টেলস্টার। কঠিন পরিস্থিতিতে দলকে এক পয়েন্ট এনে দেওয়ার পাশাপাশি নিজের নামও লিখিয়েছেন বিরল এক কীর্তির তালিকায়।
ম্যাচের শুরু থেকেই বিপাকে ছিল টেলস্টার। ২২ মিনিটেই সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন নকভি থোরিসন। ফলে ম্যাচের এক ঘণ্টারও বেশি সময় একজন কম নিয়ে খেলতে হয় স্বাগতিকদের।
বিরতির পর মাত্র সাত মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ক্যামবুর। তখন টেলস্টারের হার অনেকটাই নিশ্চিত মনে হচ্ছিল।
কিন্তু দ্বিতীয় গোল হজমের মাত্র তিন মিনিট পরই পেনাল্টি পায় টেলস্টার। দলের বিপদের মুহূর্তে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন গোলরক্ষক কোম্যান জুনিয়র। মাঠের এক প্রান্ত থেকে ছুটে এসে ১২ গজ দূরত্ব থেকে নিখুঁত শটে বল জালে জড়ান তিনি।
তাতেও অবশ্য নাটক শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ের ১১ মিনিটে আবারও পেনাল্টি পায় টেলস্টার। এবারও স্পটকিক নিতে এগিয়ে আসেন কোম্যান জুনিয়র। দ্বিতীয়বারও কোনো ভুল করেননি তিনি। তাঁর জোড়া গোলে ২-২ সমতায় ফেরে টেলস্টার এবং নিশ্চিত হয় গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট।
গোল করাই যেন কোম্যান জুনিয়রের বিশেষত্ব
এই দুই গোলের পর ২০২৬ সালে টেলস্টারের হয়ে করা সব গোলই এখন কোম্যান জুনিয়রের। চাপের মুহূর্তে গোল করে দলকে বাঁচানোর অভিজ্ঞতাও তাঁর নতুন নয়।
গত মৌসুমের শেষ দিনে ভলেন্ডামের বিপক্ষে ম্যাচের ৮৯ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন তিনি। সেই গোলেই ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল টেলস্টার, যা দলটির এরেডিভিসিতে টিকে থাকা নিশ্চিত করেছিল।
স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এই কীর্তির সঙ্গে তুলনা চলে আসছে বাবা রোনাল্ড কোম্যানের। ডিফেন্ডার হয়েও গোল করার ক্ষেত্রে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। বার্সেলোনা, পিএসভি, আয়াক্স ও ফেইনুর্দের হয়ে ক্লাব ক্যারিয়ারে দুর্দান্ত সাফল্য পাওয়া কোম্যান ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে করেছেন ২৫৪ গোল। এর মধ্যে ১১৫টি ছিল পেনাল্টি থেকে। অবশ্য ক্যারিয়ারে ১৬টি পেনাল্টিও মিস করেছিলেন তিনি।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচ হিসেবেও সফল ক্যারিয়ার গড়েছেন রোনাল্ড কোম্যান। সাউদাম্পটন, এভারটন ও বার্সেলোনার মতো ক্লাবের দায়িত্ব সামলানোর পর নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, বাবার পথ অনুসরণ না করে গোলরক্ষক হিসেবেই নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন কোম্যান জুনিয়র।
বার্সেলোনায় জন্ম, টেলস্টারে উত্থান
কোম্যান জুনিয়রের জন্মও ফুটবলের বড় মঞ্চের সঙ্গে জড়িয়ে। বাবা যখন বার্সেলোনার হয়ে ক্যাম্প ন্যু মাতাচ্ছেন, তখনই তাঁর জন্ম। নেদারল্যান্ডসের আলমেরে সিটির হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর খেলেছেন টপ ওসেতে।
২০২১ সালের গ্রীষ্মে টেলস্টারে যোগ দেন কোম্যান জুনিয়র। ২০২৫ সালে প্লে-অফের মাধ্যমে টেলস্টারের শীর্ষ লিগে ওঠার পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর।
এবার এরেডিভিসিতে ফিরে নতুন মৌসুমের শুরুতেই নিজের সামর্থ্যের আরেকটি অনন্য উদাহরণ দেখালেন ৩১ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক।
ক্যামবুরের বিপক্ষে ড্রয়ের পর চার ম্যাচে টেলস্টারের সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৪ পয়েন্ট। টেবিলে তারা আছে ১৩ নম্বরে। ৪৭ বছর পর শীর্ষ লিগে ফেরা দলটি এখনো এরেডিভিসিতে নিজেদের জায়গা শক্ত করার লড়াইয়ে রয়েছে। আর সেই লড়াইয়ে গোলপোস্টের নিচে থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনের মুহূর্তে গোল করে দলকে পয়েন্ট এনে দিচ্ছেন রোনাল্ড কোম্যান জুনিয়র।
0 মন্তব্য