জমি কেনাবেচায় মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি ও তথ্যের অসংগতির কারণে প্রতারণার শিকার হন অনেকেই। বিক্রেতার কথায় বিশ্বাস করে জমি কেনার পর দেখা যায়, সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে তাঁর দেওয়া তথ্যের মিল নেই। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আইনি জটিলতায়ও পড়তে হয় ক্রেতাকে। তবে জমি কেনার আগে ঘরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সরকারি ভূমিসেবা ওয়েবসাইটে জমির রেকর্ড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া সম্ভব।
সরকারি অনলাইন ভূমিসেবার মাধ্যমে জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং রেকর্ডে থাকা মালিকের নামসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা যায়। তবে অনলাইনে পাওয়া তথ্যই জমির চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ নয়। তাই জমি কেনার আগে রেকর্ডের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি।
যেভাবে মোবাইলে জমির তথ্য যাচাই করবেন
জমির রেকর্ড যাচাই করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট land.gov.bd অথবা অনলাইন খতিয়ান সেবার ওয়েবসাইট dlrms.land.gov.bd ব্যবহার করা যায়।
প্রথমে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে খতিয়ান বা জমির রেকর্ড অনুসন্ধানের সেবা নির্বাচন করতে হবে। এরপর জমির অবস্থান অনুযায়ী জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও মৌজার তথ্য দিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী খতিয়ান নম্বর বা দাগ নম্বর ব্যবহার করে অনুসন্ধান করা যায়। সেবাটিতে নাম দিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ থাকলে সেই পদ্ধতিও ব্যবহার করা যেতে পারে।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড পাওয়া গেলে সেখানে উল্লেখ করা মালিকের নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, জমির শ্রেণি ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে। এতে জমিটি কার নামে রেকর্ড করা রয়েছে, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে।
জমির রেকর্ডে যেসব তথ্য মিলিয়ে দেখবেন
অনলাইনে জমির তথ্য যাচাইয়ের সময় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। যেমন—
মালিকের নাম: রেকর্ডে উল্লেখিত মালিকের নাম বিক্রেতার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলছে কি না।
খতিয়ান ও দাগ নম্বর: জমির খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর সঠিক কি না।
জমির পরিমাণ: রেকর্ডে উল্লেখিত মোট জমির পরিমাণ এবং বিক্রেতার দাবিকৃত অংশের মধ্যে মিল রয়েছে কি না।
মৌজা ও জমির অবস্থান: জমিটি সঠিক মৌজা ও এলাকায় অবস্থিত কি না।
জমির শ্রেণি: জমিটি বসতভিটা, কৃষিজমি নাকি অন্য কোনো শ্রেণির।
রেকর্ডের অবস্থা: সংশ্লিষ্ট রেকর্ড হালনাগাদ কি না এবং পরবর্তী সময়ে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না।
জমিটি সরকারি নাকি ব্যক্তিমালিকানাধীন, কিংবা সেটি নিয়ে কোনো মামলা বা বিরোধ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও ভূমি অফিসের তথ্য যাচাই করতে হবে। শুধু অনলাইন রেকর্ড দেখে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
জমি কেনার আগে যেসব কাগজপত্র যাচাই জরুরি
জমি কেনার ক্ষেত্রে শুধু খতিয়ান বা অনলাইন রেকর্ডের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বিক্রেতার মালিকানার দলিল, আগের দলিলগুলোর ধারাবাহিকতা, নামজারি, খতিয়ান, দাগ নম্বর এবং ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করতে হবে।
পাশাপাশি জমির প্রকৃত দখল, সীমানা ও পরিমাণ সরেজমিনে মেপে দেখা জরুরি। জমিটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশদের অধিকার ও মালিকানার অংশও যাচাই করতে হবে।
এ ছাড়া জমিটি নিয়ে কোনো মামলা, বন্ধক বা অন্য কোনো আইনি জটিলতা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
অনলাইন রেকর্ড দেখলেই কি মালিকানা নিশ্চিত?
অনলাইনে প্রদর্শিত তথ্য জমির মালিকানা যাচাইয়ের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে সহায়ক হলেও এটি একাই চূড়ান্ত মালিকানার নিশ্চয়তা দেয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেকর্ড হালনাগাদ না-ও থাকতে পারে। আবার দলিল, নামজারি ও খতিয়ানের তথ্যের মধ্যে অসংগতিও থাকতে পারে।
তাই জমি কেনার আগে সংশ্লিষ্ট সব নথির তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনে ভূমি অফিস থেকে যাচাই করে নেওয়া জরুরি। শুধু কারও নামে খতিয়ান থাকলেই জমিটির ওপর তাঁর নিরঙ্কুশ ও বৈধ মালিকানা রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
প্রতারণা এড়াতে প্রয়োজন সতর্কতা
জমি কেনাবেচায় প্রতারণা ও আর্থিক ক্ষতি এড়াতে বিক্রেতার মৌখিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সরকারি রেকর্ড, মূল দলিল ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি জমির দখল, সীমানা এবং আইনি অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কেনার আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করলে জমির মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি ও ভবিষ্যতের জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
0 মন্তব্য