কাজের ফাঁকে বাগানের পরিচর্যা, কখনো ধানখেতে, আবার কখনো মাছের পুকুরে। চাকরির পাশাপাশি কৃষিকাজেই যেন তাঁর যত ব্যস্ততা। শুধু নিজের জীবিকা নয়, কৃষির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বড় উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন পানছড়ির ইউনিয়ন আনসার প্লাটুন কমান্ডার সুমন্ত চাকমা।
খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার ২ নম্বর চেংগী ইউনিয়নের জীতেন্দ্রপাড়ার বাসিন্দা সুমন্ত। বাবা সাধন মনি চাকমা ও মা সুচমা চাকমার সন্তান তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অষ্টম শ্রেণি পাস হলেও কৃষি উদ্যোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর আগ্রহ ও দক্ষতা চোখে পড়ার মতো।
নিজের ছয় একর জমিতে গড়ে তুলেছেন নানা জাতের আমের বাগান। সেখানে রয়েছে আম্রপালি, বার্মিজ রাঙ্গুয়াই, ব্যানানা ম্যাংগো, কাটিমন, কিউজাই ও বারি-৪ জাতের আম। আট-নয় বছর বয়সী বাগানটিতে প্রতিবছরই ভালো ফলন হচ্ছে। আমের পাশাপাশি রয়েছে মাল্টা, কলা, লেবু, পেয়ারা, নারকেল, লটকন ও লিচুর গাছ।
ফল চাষের পাশাপাশি তিন একর জমিতে ধান আবাদ করেন সুমন্ত। আছে সবজির বাগানও। গোলআলু, মূলা, কুমড়াশাক, টমেটো, লাউ, মিষ্টিকুমড়া ও বেগুন চাষ করে বৈচিত্র্য এনেছেন তাঁর কৃষি উদ্যোগে। এ ছাড়া গরু-ছাগল পালন এবং পুকুরে মাছ চাষও করছেন। সব মিলিয়ে এসব খাত থেকে বছরে তাঁর আয় প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা।
চাকরির দায়িত্ব পালনের পর অবসর সময়ে বাগান ও খেতের পরিচর্যা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক নিয়োগ দিলেও নিজেও সমানতালে কাজ করেন। তাঁর কাছে কৃষিকাজ শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কিছু করার সুযোগ।
কৃষিকাজের পাশাপাশি সমাজের নানা অসংগতির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজও করেন সুমন্ত। নিজ উদ্যোগে মাদক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখেন তিনি। কোনো এলাকায় কারও মৃত্যু হলে শ্মশানে দাহকাজের জন্য লাকড়ি সংগ্রহেও সহযোগিতা করেন। দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের বই-খাতা কিনে দেওয়ার মতো মানবিক কাজেও এগিয়ে আসেন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজের মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি।
সম্প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতার আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সুমন্ত। নিজের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চেংগী নদীর ওপর নির্মাণ করেছেন বাঁশের সেতু। লোগাং ও চেংগী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের চলাচল সহজ করতে শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার পাশাপাশি নিজেও শ্রম দিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার পথচারী এবং শত শত শিক্ষার্থী যাতায়াত করতে পারছেন।
সুমন্তের এসব উদ্যোগে খুশি এলাকাবাসীও। তাঁদের ভাষ্য, নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেও মানুষের বিপদে-আপদে এগিয়ে আসেন তিনি। কৃষি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করছে।
নিজের পরিশ্রম, কৃষির প্রতি ভালোবাসা আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সুমন্ত চাকমা। তাঁর স্বপ্ন, কৃষি উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণ করে বড় উদ্যোক্তা হওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণে আরও বেশি ভূমিকা রাখা।
প্রতিবেদক: আরমান হোসাইন
পদবি: উপজেলা প্রতিনিধি, পানছড়ি, খাগড়াছড়ি।
0 মন্তব্য