বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ’—এই প্রবাদের অন্যতম সার্থক প্রতিফলন নবান্ন উৎসব। নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দ, পিঠা-পায়েসের আয়োজন আর লোকজ সংস্কৃতির নানা উপস্থাপনায় প্রতিবছর বাঙালির জীবনে ফিরে আসে এই উৎসব। গ্রামীণ ঐতিহ্যের গণ্ডি পেরিয়ে নবান্ন এখন শহরেও উদ্যাপিত হচ্ছে নানা আয়োজনে।
রাজশাহীর টি-বাঁধ এলাকায় পিপরা কনভেনশন সেন্টারে ৩ থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত চলছে এ নবান্ন মেলা।
নবান্ন শব্দের অর্থ নতুন অন্ন বা নতুন চাল। হেমন্তে নতুন আমন ধান কাটা ও ঘরে তোলার পর সেই ধানের চাল দিয়ে প্রথম রান্না ও আহারকে কেন্দ্র করেই পালিত হয় নবান্ন উৎসব। সাধারণত বাংলা অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিনে এ উৎসব উদ্যাপন করা হয়।
অগ্রহায়ণ এলেই বাংলার মাঠজুড়ে দেখা মেলে পাকা সোনালি ধানের। কৃষকের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অপেক্ষার ফসল ঘরে তোলার আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে গ্রামবাংলা। ধান কাটা, মাড়াই এবং ঢেঁকিতে নতুন ধান ভাঙার ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য একসময় নবান্ন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
নতুন চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের পিঠা-পুলি, পায়েস, ক্ষীর, মুড়ি, খই ও নারকেলের নাড়ু। অনেক এলাকায় সকালে নতুন চালের পায়েস তৈরি করে পরিবারের গুরুজনদের পরিবেশন করা হয়। লোকজ সংস্কৃতিতে নতুন খাবার পশুপাখিকে খাওয়ানোর রীতিও প্রচলিত রয়েছে।
একসময় নবান্ন উৎসব মূলত গ্রামীণ জনপদে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরেও নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করছে নবান্ন উৎসব, পিঠা মেলা ও লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এরই ধারাবাহিকতায় রাজশাহীর টি-বাঁধ এলাকার পিপরা কনভেনশন সেন্টারে চলছে নবান্ন উৎসব মেলা। মেলায় লালনগীতি, বাউল গান, লোকনৃত্য ও পিঠা উৎসবসহ নানা আয়োজন রাখা হয়েছে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবস্থল হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত।
নবান্ন উৎসব শুধু নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ উদ্যাপন নয়, এটি কৃষকের শ্রম ও অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ারও একটি উপলক্ষ। একই সঙ্গে এ উৎসব মানুষের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করে।
বাংলার লোকজ গান, কবিতা, নাচ ও মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখতেও নবান্ন উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আধুনিকতার প্রভাবে গ্রামীণ অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসলেও নতুন ফসলের আনন্দ আর লোকজ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে নবান্ন আজও বাঙালির হৃদয়ে বিশেষ জায়গা ধরে রেখেছে।
নতুন ধানের ঘ্রাণ, পিঠা-পায়েসের স্বাদ আর সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে নবান্ন উৎসব আগামী দিনেও বাঙালির ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও আনন্দের প্রতীক হয়ে থাকবে—এমন প্রত্যাশা আয়োজক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের।
0 মন্তব্য