বছর চারেক আগে নারায়ণগঞ্জ থেকে কেনা মাত্র ৫টি সিল্কি মুরগি দিয়ে শখের বশে যা শুরু হয়েছিল, তা এখন ২২টি দেশি ও বিদেশি জাতের মুরগির এক সমৃদ্ধ সংগ্রহে পরিণত হয়েছে। একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতার পেশার পাশাপাশি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার শ্রীরামপুর এলাকার বাসিন্দা মো. মোবারক হোসেন একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আজ তিনি এলাকার অনেক শিক্ষিত বেকার যুবকের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হন।
মোবারক (৩১) শ্রীরামপুরে তার বাসভবনের পিছনে আগে অব্যবহৃত এক খণ্ড নিচু জমিতে তার নিজস্ব পোল্ট্রি খামার ‘মোল্লা এগ্রো ফার্ম’ গড়ে তুলেছেন। এই খামারে বিশ্বের কয়েকটি বৃহত্তম এবং ক্ষুদ্রতম মুরগির প্রজাতি রয়েছে। এরমধ্যে কলম্বিয়ান ‘লাইট ব্রহ্মা’ এবং ‘মালয়েশিয়ান সেরামা’ অন্যতম।
খামারটিতে বর্তমানে ২২টি বিভিন্ন জাতের প্রায় ৪০০টি পাখি রয়েছে। এরমধ্যে হোয়াইট, ব্ল্যাক টেইল, মটলড, গোল্ডেন সেব্রাইট, সিলভার সেব্রাইট, বাফ সেব্রাইট, সিল্কি, সেরামা, অস্ট্রালর্প, কড়কনাথ, ব্রহ্মা, পুলিশ ক্যাপ, হোয়াইট ফ্রিজল পুলিশ ক্যাপ এবং স্থানীয় পাহাড়ি জাত অন্তর্ভুক্ত। এখানে প্রায় ৫শ’ গ্রাম ওজনের একটি বিশেষ জাতের কোয়েলও রয়েছে।
শোভাবর্ধক এবং বাণিজ্যিক উভয় ধরনের পোল্ট্রির সমন্বয়ে খামারটি স্থানীয়ভাবে যথেষ্ট স্বীকৃতি অর্জন করেছে। পোল্ট্রি পালনের পাশাপাশি মোবারক তার নিজস্ব ইনকিউবেটর মেশিনে ডিম ফুটিয়ে কৃত্রিম পদ্ধতিতে বাচ্চা উৎপাদন করেন।
অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমে শৌখিন মুরগি বিক্রি করে তিনি বর্তমানে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করেন।
এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে গিয়ে মোবারক বলেন, ‘চার বছর আগে আমি অল্প অল্প করে একবারে ১শ’ বা ২শ’ টাকা করে জমিয়ে ২৫শ’ টাকায় ৫ টি সিল্কি মুরগি কিনেছিলাম। এভাবেই আমার শুরু। এখন আমি ২২টি দেশি ও বিদেশি জাতের চারশ’ মুরগি নিয়ে দু’টি খামার পরিচালনা করি। এই খাতে অপার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশি জাতের মুরগি পালন একটি অত্যন্ত লাভজনক উদ্যোগ এবং বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। আমি আগ্রহী উদ্যোক্তাদের আমার খামার পরিদর্শনে স্বাগত জানাই। তারা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং আগ্রহী হলে আমি সানন্দে দিকনির্দেশনা ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করব।’
মোবারক বিশ্বাস করেন, শখের বশে পালনকারী থেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার তার এই যাত্রা অনেক তরুণ চাকরি প্রার্থীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন,মুরগির খামার শুরু করার আগে সঠিক প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, ‘সতর্ক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পোল্ট্রি খামার একটি লাভজনক ও সম্ভাবনাময় পেশা হয়ে উঠতে পারে’।
তার খামারে প্রতিদিন দর্শনার্থীদের সমাগম হয় বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকরা। অনেকে আধুনিক পোল্ট্রি পালনের কৌশল ও খামার ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে আসেন এবং অনেকেই নিজেরাও এই খাতে প্রবেশ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী রিপন মিয়া বলেন, ‘এটা আমার জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা ছিল। এক জায়গায় এতগুলো সুন্দর বিদেশি জাতের মুরগি দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি এরআগে এমন কিছু দেখিনি। মোবারক হোসেন রায়পুরার একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তা, যিনি পোল্ট্রি খামারের মাধ্যমে সফল হয়েছেন। আমি ভবিষ্যতে এমন একটি খামার প্রতিষ্ঠা করার আশা রাখি।’
আরেকজন দর্শনার্থী ২৫ বছর বয়সী জুনাইদ হোসেন বলেন, ‘আমি খামারটি ঘুরে দেখেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। আমি জীবনে কখনও একসাথে এত বিভিন্ন জাতের মুরগি দেখিনি। মোবারক ভাইয়ের খামার আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তার পরামর্শ নেয়ার পর আমি একটি পোল্ট্রি খামার শুরু করার কথা ভাবছি।’
রায়পুরা উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, স্কুল শিক্ষক মোবারক হোসেন বর্তমানে রায়পুরা পৌরসভায় ২০ থেকে ২৫টি বিদেশি জাতের মুরগি পালন করছেন।
তিনি বলেন, ‘তিনি অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমেই এই মুরগিগুলো বিক্রি করে লাভ করছেন। তার এই সাফল্য অন্যদেরও পোল্ট্রি পালনে আগ্রহী হতে উৎসাহিত করছে। এ ধরনের উদ্যোগ মানুষকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করার পাশাপাশি বেকারত্বও কমাতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ এই বিদেশি জাতের মুরগিগুলোর রোগ প্রতিরোধ ও সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে কৃষকদের কারিগরি পরামর্শ, কৃমিমুক্তকরণ সহায়তা এবং টিকাদান পরিষেবা প্রদান করছে।
0 মন্তব্য