দেশের বৈদেশিক খাতে রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানির ইতিবাচক প্রবাহ অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক চিত্র এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়লেও সেই অর্থ উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে রূপান্তরিত হচ্ছে না। ফলে কর্মসংস্থান, আয় ও প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ আরো বাড়ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) জুন-২০২৬ অর্থনৈতিক হালনাগাদ ও পূর্বাভাস প্রতিবেদনে এমন চিত্র তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের মে মাসের ২.৯৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে চলতি অর্থবছরের মে মাসে রেমিট্যান্স ৩.৪২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রায় ১৫.৬ শতাংশ বেড়েছে। মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশ, যা এপ্রিলে ছিল ৯.০৪ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫৭ শতাংশ থেকে ৯.৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে প্রায় সব খাতেই মূল্যচাপ অব্যাহত রয়েছে।
এর বিপরীতে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজুরি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১.২১ শতাংশ পয়েন্ট। এর অর্থ হলো, মানুষের প্রকৃত আয় কমছে এবং ক্রয়ক্ষমতা আরো দুর্বল হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
রাজস্ব পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
মে মাসে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদায় হয়েছে মাত্র ৭৩ শতাংশ। ফলে এক মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। এই ঘাটতি সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নেও। প্রতিবেদনে বলা হয়, মে পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪৮.২৩ শতাংশ। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.২ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমে যাওয়ায় অবকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতেও এক ধরনের বৈপরীত্যের চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে আমানত প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোতে অর্থ থাকলেও উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না কিংবা ঋণ গ্রহণে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। উচ্চ সুদহার, ব্যাবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল চাহিদাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সব সূচকই নেতিবাচক নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী প্রবাস আয় এবং তৈরি পোশাক রপ্তানির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক খাতকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়েছে এবং আমদানি ব্যয় সামাল দিতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে পোশাক রপ্তানিও বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে অর্থনীতিকে সহায়তা করছে।
তবে জিইডি সতর্ক করেছে, এই ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতা কাটেনি। প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার (রিয়াল ইফেকটিভ এক্সচেঞ্জ রেট) ১০১.৭৪-এ উন্নীত হওয়ায় ভবিষ্যতে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো না গেলে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। ফলে আগামী মাসগুলোতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বৈদেশিক খাতের ইতিবাচক ধারা ধরে রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত মোকাবেলা করা।
0 মন্তব্য