ছেলের ফেরার অপেক্ষায় প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন মা। বাবার পথ চেয়ে আছে চার বছরের মেয়ে। কোলে ১১ মাসের শিশুকে নিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় স্ত্রী। অন্যদিকে, বিদেশ যাওয়ার আশায় জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা খরচ করেও এখন নিঃস্ব পরিবারটি।
মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকার সাইদুল বেপারী (৩২) ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি দিয়ে গত দুই মাস ধরে লিবিয়ায় নিখোঁজ রয়েছেন বলে পরিবারের অভিযোগ।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের অপেক্ষায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে মা সূর্যবান বেগমের।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সূর্যবান বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে—কিছুই জানি না। প্রতিদিন মনে হয়, এই বুঝি দরজা খুলে ছেলে ফিরে আসবে। আমি আমার ছেলেকে বুকের মধ্যে ফিরে পেতে চাই।
পরিবারের দাবি, ইতালি পাঠানোর কথা বলে স্থানীয় দালাল আনোয়ার ফরাজী ২৩ লাখ টাকার চুক্তিতে সাইদুলকে বিদেশে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। ২০২৫ সালের ৬ মে অগ্রিম ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে ৯ জুন শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও তাকে লিবিয়ায় পাঠানো হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
স্বজনদের অভিযোগ, লিবিয়ায় নেওয়ার পর সাইদুলকে একটি চক্রের কাছে জিম্মি করা হয়। নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময় ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ নানা মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেওয়ার পর গত দুই মাস ধরে সাইদুলের সাথে পরিবারের আর কোনো যোগাযোগ নেই।
সাইদুলের স্ত্রী মেরি আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়েটা প্রতিদিন আব্বুর সাথে কথা বলতে চায়। মোবাইল হাতে নিয়ে বলে, আব্বুর সাথে কথা বলবে। কিন্তু আব্বু তো আর ফোনের ওপাশে নেই। দুই সন্তানকে কীভাবে মানুষ করব, সংসার কীভাবে চালাব—বুঝতে পারছি না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার পর সংসারে নেমে এসেছে চরম আর্থিক সংকট। জমিজমা ও ঘরবাড়ির অনেক কিছু বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার টাকা জোগাড় করা হয়েছে। এখন সন্তানদের খাবার জোগাড় করতেও স্থানীয়দের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সাইদুলের ভাই মাহিদুল বেপারীর অভিযোগ, ‘ইতালিতে নেওয়ার কথা বলে আমার ভাইকে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আমরা সবকিছু হারিয়েছি। আমরা দালালদের বিচার ও আমার ভাইয়ের সন্ধান চাই।
এ ঘটনায় গত ১১ সেপ্টেম্বর সাইদুলের বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে আনোয়ার ফরাজী, শিল্পী আক্তার, বাদল জমাদ্দার, সাহেব আলী জমাদ্দার, মামুন বেপারী, ইভা বেগম ও ছলে বেগমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মাদারীপুরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।
তবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত আনোয়ার ফরাজী ওরফে আনো ফরাজী। তার দাবি, ‘আমি তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেইনি।’ তার স্ত্রী শিল্পী আক্তার অবশ্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার না করে বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে ১৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।
মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার আদালতে মামলা করেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছালে বিষয়টি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, পরিবারের দাবি—নিখোঁজ সাইদুলের অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি মানব পাচারের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
0 মন্তব্য