বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশই জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পর্যাপ্ত বা পূর্ণাঙ্গ বুকের দুধ পায়নি। একই সঙ্গে হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছিল। এর মধ্যে ১২ শতাংশ ছিল তীব্র এবং ৫৩ শতাংশ মাঝারি মাত্রার অপুষ্টির শিকার।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট (বাশিই) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত গবেষণার ফলাফল অবহিতকরণ সভায় এসব তথ্য জানানো হয়।
চলতি বছরের মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত বা হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩৪১ শিশুর ওপর গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, গবেষণাটি এখনো চলমান।
গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৪৩ শতাংশের বয়স ছিল তিন থেকে নয় মাসের মধ্যে। মোট আক্রান্ত শিশুদের ৩৮ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গ বুকের দুধ পায়নি। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়ার হার ছিল অনেক বেশি—৮২ শতাংশ।
অপুষ্টিতে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশু
হামে আক্রান্ত শিশুদের পুষ্টিগত অবস্থাও বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা। এতে দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশই কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছিল। এর মধ্যে ১২ শতাংশ তীব্র অপুষ্টি এবং ৫৩ শতাংশ মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে আক্রান্ত ছিল।
গবেষণায় শিশুদের বয়স ও টিকা গ্রহণের তথ্য অনুযায়ী চারটি দলে ভাগ করা হয়। নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়স হয়নি এমন নয় মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়, যা ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার পরও কোনো টিকা না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ হার ৯৭ শতাংশ। এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা ৯২ শতাংশ।
অন্যদিকে, সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ হার ৭৬ শতাংশ।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ফলাফলের অর্থ এই নয় যে দুই ডোজ টিকা নেওয়া ৭৬ শতাংশ শিশুই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ গবেষণাটি সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর নয়, বরং হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নির্দিষ্ট শিশুদের ওপর পরিচালিত হয়েছে। ফলে দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ সন্দেহভাজন শিশুর মধ্যে ১৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, টিকা নেওয়ার পর পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি কিংবা ব্যক্তিভেদে অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ সংক্রমণের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব কারণের কোনটি কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা বর্তমান গবেষণার উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল না।
শনাক্ত হাম ভাইরাস বি৩ সাবক্লেডের
গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের শরীরে শনাক্ত হওয়া হাম ভাইরাসের ধরনও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, শনাক্ত হওয়া সব হাম ভাইরাস বি৩ সাবক্লেডের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শনাক্ত হওয়া বি৩ ভাইরাসের সঙ্গেও এসব ভাইরাসের মিল রয়েছে।
এ ছাড়া ভাইরাসের এইচ (H) প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারে এমন এপিটোপ অঞ্চলে চারটি পরিবর্তন বা মিউটেশন শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র ডিরেক্টর ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
গবেষণার ফলাফল অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী।
0 মন্তব্য