বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বা অলস টাকা বেড়ে চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। একদিকে আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগে গতি না থাকায় ব্যাংকগুলো বাড়তি অর্থ খাটাতে পারছে না।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে। এর সঙ্গে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর বাড়তি সতর্কতা যোগ হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে গেছে। ফলে ভালো ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়লেও সেই অর্থ বিনিয়োগে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল চার লাখ আট হাজার কোটি টাকা। মে মাসে এর পরিমাণ ছিল তিন লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি। চলতি বছরের মার্চ শেষে অতিরিক্ত তারল্য ছিল তিন লাখ ৭৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে যাওয়ায় কিছু ব্যাংক এখন অর্থ খাটানোর উপযুক্ত ক্ষেত্রও পাচ্ছে না।
সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড, কলমানি মার্কেট কিংবা অন্য ব্যাংকে আমানত রাখার পরও অতিরিক্ত অর্থ থেকে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটিতে (এসডিএফ) অর্থ জমা রাখছে ব্যাংকগুলো।
এদিকে আমানত ও ঋণের প্রবৃদ্ধির ব্যবধানও পরিস্থিতির চিত্র স্পষ্ট করছে। জুনে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.৭৪ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪.৪৭ শতাংশে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, নতুন শিল্প ও ব্যাবসায়িক বিনিয়োগে ঋণের চাহিদা খুবই কম। বর্তমানে যে ঋণ বিতরণ হচ্ছে, তার বড় অংশই ভোগ্য পণ্য ও কাঁচামাল আমদানির কাজে যাচ্ছে। পাশাপাশি কিছু ভোক্তা ঋণও দেওয়া হচ্ছে। শিল্প-ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ না বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ার সুযোগ কম। তাঁদের মতে, অতীতে ব্যাংকিং খাতে যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিপুল অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। এসব ঋণের একটি বড় অংশ প্রকৃত বিনিয়োগে ব্যবহার করা হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ ৎদেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক। ফলে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিক থেকেই বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে সম্প্রতি নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও বন্ধ কলকারখানা চালুতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো ৪১ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ঋণের সুদ কমলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কিছুটা গতি ফিরতে পারে। তবে শুধু সুদহার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে না। উদ্যোক্তাদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, স্থিতিশীল করনীতি এবং ঘুষ-দুর্নীতি কমানোও জরুরি। এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক অতিরিক্ত তারল্য স্থায়ী নয়। বাজেট পাস হওয়া এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়ছে। তবে ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থের কাস্টডিয়ান। তাই এ অর্থ বিনিয়োগে ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাইক্রো, কটেজ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বড় বড় বিনিয়োগ আপাতত কিছুটা দূরে রাখা উচিত।
বিনিয়োগের পরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বালানি-তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন সুবিধা এবং কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমানোও জরুরি। এসব বিষয় ধীরে ধীরে ঠিক হচ্ছে। একসময় এগুলো খুব খারাপ অবস্থায় চলে গিয়েছিল, তবে এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তাঁর মতে, বর্তমান তারল্য পরিস্থিতি সাময়িক। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ধীরে ধীরে ব্যাংকিং খাতের সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
0 মন্তব্য