সরাসরি জনগণের কাছে ঋণ নেওয়ার দুয়ার বড় করছে সরকার। সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ঋণের সিংগভাগই নেওয়া হবে সরাসরি জনগণের কাছ থেকে। এ লক্ষ্যে ঋণ নেওয়ার বিভিন্ন উপকরণ-ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড, ইসলামিক বন্ড, শরিয়াভিত্তিতে পরিচালিত সুকুক বন্ড বাজারে আনা হয়েছে। এগুলোতে দেওয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় মুনাফা। বিনিয়োগের পরও থাকছে নানা সুবিধা। এসব সুবিধা সংবলিত ট্রেজারি বন্ড ও বিল সরাসরি জগণের কাছে বিক্রি করে ঋণ নেবে সরকার। এ লক্ষ্যে ট্রেজারি বিল ও বন্ড কেনার পদ্ধতিও আগের তুলনায় বেশ সহজ করা হয়েছে। ফলে এখন জনগণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিলামে অংশ নিয়ে ট্রেজারি বন্ড ও বিল কিনতে পারছে। আন্তঃব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে এসব বন্ড বিল মেয়াদপূর্তির আগেই বিক্রি করে টাকা নগদায়ন করতে পারছে। এ পদ্ধতি আরও সহজ করার প্রক্রিয়া চলছে।
সূত্র জানায়, এ প্রক্রিয়া পুরোপুরি চালু হলে সরকারকে ঋণের জন্য আর ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানিমুখী হতে হবে না। এমন কি হতে হবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকমুখীও। বছরওয়ারি পরিকল্পনা করে বা জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবেও বন্ড ও বিল বিক্রি করে সরাসরি জনগণের কাছ থেকে ঋণ নিতে পারবে। বর্তমানে সরকার যে ঋণ নিচ্ছে তার বড় অংশই ব্যাংক থেকে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুটপাট ও অর্থনৈতিক মন্দায় ব্যাংকগুলোর দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারকে চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলো তারল্যের চাপে পড়ছে। এতে একদিকে ঋণের সুদহার বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাত চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থা এড়ানোর জন্য সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ কমিয়ে সরাসরি জনগণের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। এ উদ্যোগ সফল হলে বেসরকারি খাত চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পাবে। ব্যাংকের তারল্যের প্রবাহ বেশি থাকবে বলে ঋণের সুদের হারও সহনীয় মাত্রায় থাকবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে। কারণ দেশের অর্থনীতির সিংহভাগই নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি খাত। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রি করে। প্রাইমারি ডিলারদের মাধ্যমে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে বেচাবিক্রি হয়। এছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত বন্ডগুলো সেকেন্ডারি মার্কেটে বেচাকেনা হয় খুব সীমিত আকারে। বর্তমানে বাজারে সরকারি খাতের তিন ধরনের স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিল, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ৬টি ট্রেজারি বন্ড, স্বল্পমেয়াদি দুটি ইসলামিক বন্ড ও শরিয়াভিত্তিতে পরিচালিত একটি সুকুক বন্ড রয়েছে।
ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বিপরীতে গ্রাহকদের আকর্ষণীয় মুনাফা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৯১ দিন (৩ মাস) মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ। ১৮২ দিন (৬ মাস) মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন (এক বছর) মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
বন্ডের মধ্যে ২ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সরকার ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ৩ বছর মেয়াদি ভাসমান সুদহারভিত্তিক ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সরকার ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ। ১০ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সরকার ট্রেজারি বন্ড সুদহার ১০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ১৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সরকার ট্রেজারি বন্ড সুদহার ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সরকার ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ।
৫ বছর মেয়াদি ৮ম বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ বন্ড সুকুকের মুনাফার হার ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ।
৩ মাস মেয়াদি বাংলাদেশ সরকার ইসলামী বিনিয়োগ বন্ডের মুনাফার হার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ৬ মাস মেয়াদি বাংলাদেশ সরকার ইসলামী বিনিয়োগ বন্ডের মুনাফার হার ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এসব বিল বা বন্ডের মুনাফার হার উঠানামা করে। সরকারের ঋণের চাহিদা ও গ্রাহকদের টাকার জোগানের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিলামে মুনাফার হার নির্ধারিত হয়। বর্তমানে ভালো ব্যাংকগুলোর সঞ্চয় স্কিম ও সরকারি সঞ্চয়পত্রের চেয়ে কিছু বন্ডে মুনাফার হার বেশি। মেয়াদপূর্তির আগের নগদায়ন করলে ব্যাংকের সঞ্চয়ী উপকরণ ও সরকারি সঞ্চয়পত্রে মুনাফা খুবই কম পাওয়া যায়। ট্রেজারি বিল বা বন্ডে সে তুলনায় ভালো মুনাফা মেলে। প্রতি ৬ মাস পরপর মুনাফা গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে দেওয়া হয়। সুকুক সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকায় কেনা যায়। অন্যান্য ট্রেজারি বিল ও বন্ড সর্বনিম্ন এক লাখ টাকায় কিনতে হয়।
আগে এসব বিল ও বন্ডে জনগণের বিনিয়োগের সুযোগ ছিল না। এখন নীতিমালা সহজ করায় সাধারণ গ্রাহকরা যে কোনো ব্যাংকে গ্রাহকের নিজস্ব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিল বন্ড কেনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিলামে অংশ নিতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় অনেক গ্রাহক এখন সঞ্চয়ের উপকরণ হিসাবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডকে বেছে নিচ্ছে। কারণ এতে যেমন মুনাফার হার বেশি, তেমনি শতভাগ সরকারি গ্যারান্টি যুক্ত। এ কারণে গ্রাহকরাও এর প্রতি ঝুঁকছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে লোভনীয় হচ্ছে শরিয়াভিত্তিতে পরিচালিত সরকারের বিনিয়োগ বন্ড সুকুক। এর প্রতি সঞ্চয়কারীদের আগ্রহ থাকায় এতে বিনিয়োগ নীতিমালাও সহজ করা হয়েছে। এখন যে কোনো ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানিতে গ্রাহকরা সুকুক ইনভেস্টর আইডি খুলতে পারবে। এর মাধ্যমে গ্রাহক বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠেয় নিলামেও অংশ নিতে পারবে। বুধবার ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকার সুকুক ইস্যু করা হয়েছে। এর জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ৭২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার। শরিয়াভিত্তিক বন্ড হওয়ায় এর প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ বেড়েছে। ২০২০ সালে প্রথম সুকুক বন্ড ইস্যু করা হয়। জানুয়ারি পর্যন্ত এতে স্থিতি ছিল ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে বিভিন্ন খাতের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়।
বর্তমানে সরকারের ঋণের মোট স্থিতি ১০ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রি করে নেওয়া হয়েছে ৭ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থের প্রায় শতভাগই বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করে নেওয়া হয়। জনগণের কাছে বিক্রির পরিমাণ খুবই কম। এখন জনগণের কাছে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেননা বিল ও বন্ডে স্থানীয় ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসীদেরকেও বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
0 মন্তব্য