আর্থিক সংকট, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) শিল্প উদ্যোক্তারা। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ও ব্যবসাকে সহজ করতে উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন।
সংগঠনটি অর্থনৈতিক সাক্ষরতা (ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি) কর্মসূচির আওতায় উদ্যোক্তাদের ব্যাংক পরিচিতি, ঋণ পরিচিতি, ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন (ম্যাচ মেকিং), ব্যবসার ডকুমেন্টেশন, সচেতনতা তৈরিসহ নানা ধরণের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ফলে উদ্যোক্তরা তাদের ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধান করে লাভের মুখ দেখছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, বর্তমানে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ। আর এই এসএমই খাত দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, এই শিল্প উদ্যোক্তাদের বিকাশে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি দৃশ্যমান কাজ করে যাচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি কর্মসূচি, এসএমই মেলা, নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলছে। এর মধ্যেÑ ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি কর্মসূচি বেশ আলোচনায় রয়েছে।
ফাউন্ডেশন আরও জানায়, এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিবছর প্রায় আড়াই হাজার প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শুধু উদ্যোক্তারাই নয়, ৫শ’ জন ব্যাংকারও প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন।
ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে: উদ্যোক্তাদের ব্যাংক পরিচিতি, ঋণের পরিচিতি, ব্যাংকের সাথে ম্যাচ মেকিং, ব্যবসায়ের ডকুমেন্টেশন, ট্রেডলাইসেন্স তৈরি এবং সচেতনতা তৈরি করা। এর বাইরে ব্যাংকারদের এসএমই সম্পর্কে এবং এসএমইদের নিয়ে সরকারের নীতি বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হয়।
কর্মসূচির বিষয়ে বিস্তারিত কথা হয় রাজধানীর রানী বুটিক ও টেইলার হাউজের উদ্যোক্তা নুরজাহান বেগমের সঙ্গে।
তিনি বলেছেন, 'এটি আমার ছোট ব্যবসা। নিজের সক্ষমতায় বেশ ভালোই চালাচ্ছিলাম, কিন্তু যখন ব্যবসাকে একটু বড় করতে চেষ্টা করিÑ তখনই অর্থের অভাব দেখা দেয়। আর ব্যাংক নিয়ে আগে থেকেই ভয় কাজ করত। তবে এ সময়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ায় এসএমই ফাউন্ডেশন।'
তিনি আরও বলেন, 'ব্যাংক কি ধরনের ঋণ দেয়, কীভাবে ঋণ নিতে হবেÑ সে সম্পর্কে ফাউন্ডেশন থেকে প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়। তাদের কাছ থেকে সাহস পেয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করি। আমার ব্যবসার আকার আগের চেয়ে বেশ বড় হয়েছে।'
পাটজাত পণ্য নিয়ে কাজ করা আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমার ছোট ব্যবসা হওয়ায় প্রথাগতভাবে (ট্রাডিশনাল) ব্যবসায় হিবাস-নিকাশ করতাম। ফরমালভাবে কোন হিসেব রাখা হয়নি। এসএমই ফাউন্ডেশন আমাকে ব্যবসার ডকুমেন্টেশন তৈরি করা শিখিয়েছে। এর ফলে যখন আমি ঋণ নিতে যাই। সহজেই আমার কাগজ দেখিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পেরেছি।’
এ বিষয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজিম হাসান সাত্তার বলেন, ‘আমাদের স্মল বা মাইক্রো এমনকি কটেজ উদ্যোক্তারা কিন্তু ব্যাংক থেকে লোন পাওয়ার জন্য তাদের যে শর্তাবলী সেগুলো পূরণ করতে পারে না। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন লেনদেন সম্পর্কে ডকুমেন্ট চায়, ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন তথ্য চায়। আমাদের ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্পের যারা আছেÑতারা কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে সব তথ্য সংরক্ষণ করে না। যার ফলে পর্যাপ্ত ডকুমেন্টেশনের অভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় নানা ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয়।’
তিনি বলেন, 'আমাদের ফাউন্ডেশন ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম, ট্রেনিং প্রদান করে থাকে। প্রথমত: ঋণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। অনেক উদ্যোক্তা আছে যাদের ঋণ নেওয়ার যোগ্যতা আছে কিন্তু ঋণ সম্পর্কে ধারণা নেই। আর এই ঋণ সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা বা ভয় থাকায় ব্যাংকারদের সাথে সরাসরি সংযুক্ত হতে পারে না, পক্ষান্তরে তারা ঋণও পায় না।'
তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তা যারা ঋণ নিতে চায় তাদেরকে আমরা প্রথমে চিহ্নিত করি। এসোসিয়েশন বা চেম্বারের তাদেরকে বলি যে, আপনাদের কারা ঋণ নিতে চায়। তখন তারা একটা তালিকা পাঠায়। তাদেরকে ব্যাংকের ঋণের শর্তগুলো সম্পর্কে আমরা অবগত করি।’
নাজিম হাসান সাত্তার বলেন, ‘পাশাপাশি আমরা ব্যাংকের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের পরিচিত করাই। একদম ফেস টু ফেস (সরাসরি)) মিটিং করানো হয়। যেখানে ব্যাংকারদের পাশাপাশি ৪০ থেকে ৫০ জন উদ্যোক্তা, প্রতিটি সহযোগী ব্যাংক থাকে। একই সঙ্গে এসএমই ঋণ প্রদানকারীদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এই মিটিং এ থাকেন।’
0 মন্তব্য