৮৫ বছর বয়সী মো. সামসুল হক। অভাবে অভাবে জীবনের পুরো সময়ই কেটেছে দুঃখ আর কষ্টে।
সুখ কী জিনিস, তা একপ্রকার অধরাই রয়ে গেছে বৃদ্ধ সামসুল হকের কাছে। চার মেয়ে আর এক ছেলের বাবা হওয়া সত্ত্বেও ১৫ বছর ধরে তাঁর ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধনিবাসে। ২০১২ সালের দিকে একমাত্র ছেলের বউয়ের অত্যাচার ও অপমান সহ্য করতে না পেরে ভোলা শহরের নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন পরিচালিত বৃদ্ধনিবাসে আশ্রয় হয় তাঁর। বৃদ্ধাশ্রমে আসার পর নিজের নামে থাকা বাড়ির সাড়ে ৩১ শতাংশ জমিও লিখে দিয়েছেন ছেলেমেয়েদের নামে।
তাঁর দেওয়া জমিতে ছেলে মফিজুর রহমান নতুন ঘর ওঠালেও সেই ঘরে জায়গা হয়নি সামসুল হকের। গতকাল বুধবার দুপুরে এভাবেই নিজের কষ্টের কথাগুলো জানান ভোলা সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বৃদ্ধ সামসুল হক।
সামসুল হক বলেন, ‘পুরোটা জীবন কৃষিকাজ করে কেটেছে আমার। কৃষিকাজ করেই বিয়ে দিয়েছি চার মেয়েকে। সংসারে অভাবের কারণে সন্তানদের তেমন পড়ালেখা করাতে পারিনি। চার মেয়ের জামাই সবাই দিনমজুর। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আমার। ২০০৬ সালে ছেলে মো. মফিজুর রহমানকে বিয়ে করানোর জন্য মেয়ে দেখি। কিন্তু আমার দেখা মেয়ে বিয়ে না করে মফিজ খালাতো বোনকে বউ করে ঘরে আনে।
তাদের ভালোর কথা চিন্তা করে সেই বিয়ে মেনে নিই। এরপর বয়সের ভারে যখন আমার কাজ বন্ধ হয়ে যায় তখন থেকেই ছেলে ও ছেলের বউয়ের ব্যবহার পরিবর্তন হতে শুরু করে। ভোলা সদর হাসপাতালের সামনে ছেলে মফিজের চা-পানের দোকান। সারা দিন সে ওখানে থাকে। ছেলে বাড়িতে না থাকায় ছেলের বউ আমাকে ঠিকমতো খাবারও দিত না। যা দিত তা দিয়ে পেটের ক্ষুধা মিটত না। এ অবস্থায় খাবার চাইলে ছেলের বউ আমাকে ঝাড়ু নিয়ে মারতে আসত। কিন্তু এসব বিষয় জেনেও বউকে কিছু বলত না ছেলে মফিজ। এ অবস্থায় ২০১১ সালের দিকে তাদের সঙ্গে রাগ ও অভিমান করে চলে আসি এই বৃদ্ধাশ্রমে। এর পর থেকেই এটাই আমার আপন ঠিকানা।’
বৃদ্ধ সামসুল হক আরো বলেন, ‘বাড়ি থেকে চলে আসার পর স্ত্রী বিলকিছ বেগম বেশির ভাগ সময় মেয়েদের কাছেই থেকেছে। ২০১৭ সালে সে মারা যায়। বৃদ্ধাশ্রমে আসার পর মেয়েরা প্রায়ই বিভিন্ন খাবার নিয়ে দেখতে আসত। কিন্তু ছেলে মফিজুর রহমান কোনো কাজ ছাড়া আমাকে দেখতে আসে না। এর পরও ছেলে কোনো ঝামেলায় পড়ে আমার কাছে এলে বাড়িতে গিয়ে সেটি সমাধান করে দিয়ে আসি।’
বাড়িতে যেতে মন চায় কি না, জানতে চাইলে সামসুল হক বলেন, ‘এখন এখানেই ভালো লাগে। ১৫ বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে থাকায় এখানকার সবাইকে আপন মনে হয়। এখানকার সবাই আন্তরিক। সময়মতো খাবারদাবারসহ সবকিছুই এখান থেকে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘সন্তানদের সুখের কথা চিন্তা করে সাত-আট বছর আগে আমার নামে থাকা সাড়ে ৩১ শতাংশ জমির মধ্যে ১২ শতাংশ জমি লিখে দিয়েছি ছেলের নামে। বাকি জমি দিয়েছি মেয়েদের। বৃদ্ধাশ্রমে আসার পর প্রথম প্রথম বাড়ি ও ছেলেমেয়েদের কথা খুব মনে পড়ত; কিন্তু এখন থাকতে থাকতে আর মনে পড়ে না। বাড়িতে গেলে বরং মন টেকে না। বাকি জীবন বৃদ্ধাশ্রমেই কাটিয়ে দিতে চাই। এখন যে অবস্থায় আছি এ অবস্থায় মৃত্যু হলেই ভালো। সন্তানদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই আমার। তারা ভালো থাকুক, এই কামনাই করি।’
0 মন্তব্য