যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যে দেশটির বৃহত্তম ইস্পাত কারখানা নির্মাণে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে ভারতের বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী এসার গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেসাবি মেটালিকস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে এ বিনিয়োগের ঘোষণা দেন বলে জানায় ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই নিউজ।
ট্রাম্প বলেন, প্রস্তাবিত কারখানাটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইস্পাত কারখানা। কারখানাটি চালু হলে বছরে ১ কোটি টন ইস্পাত উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে। তিনি বলেন, আইওয়ায় এই কারখানা নির্মাণের ঘোষণা দিতে পেরে তিনি আনন্দিত। তার ভাষ্য, এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় কারখানাই হবে না, বিশ্বের বড় ইস্পাত কারখানাগুলোর একটি হবে।
মেসাবি মেটালিকসের চেয়ারম্যান রেওয়ান্ত রুইয়া যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য উৎপাদনের গুরুত্ব ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের জন্য তিনি ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞ। রেওয়ান্ত রুইয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এই বিনিয়োগ তার কাছে ‘নিজের ঘরে ফিরে আসার মতো’। তিনি জানান, ভারতে জন্ম নেওয়ার পর নিউইয়র্ক, বোস্টন ও ক্যালিফোর্নিয়ায় পড়াশোনা করেছেন এবং জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন।
মেসাবি মেটালিকসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ইস্পাত কারখানার প্রয়োজনীয় লৌহ আকরিক আসবে মিনেসোটায় কম্পানিটির নতুন খনি থেকে। রেওয়ান্ত রুইয়া জানান, তার পরিবার মিনেসোটায় একটি নতুন লৌহ আকরিক খনিতে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। প্রায় ৫০ বছর পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রে চালু হতে যাওয়া প্রথম নতুন লৌহ আকরিক খনি হবে বলে তিনি দাবি করেন। খনি থেকে লৌহ আকরিক সরবরাহ করে আইওয়ার কারখানায় ইস্পাত উৎপাদন পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাম্পও এই বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, মিনেসোটার খনিটি কয়েক দশক পর যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হওয়া নতুন লৌহ আকরিক খনিগুলোর একটি। তার দাবি, ওই খনির আকরিকের মানও ভালো। ট্রাম্প বলেন, এর অর্থ হলো লৌহ আকরিক যুক্তরাষ্ট্রেই উত্তোলন করা হবে, সেখানেই ইস্পাত তৈরি হবে এবং সেই ইস্পাত যুক্তরাষ্ট্রেই ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হবে।
নতুন প্রকল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ নিয়ে অনুষ্ঠানে কিছুটা ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে। মেসাবি মেটালিকসের মালিকপক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছে। বর্তমান বিনিময় হারে এর পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার ৬৩৪ কোটি বাংলাদেশি টাকা (প্রতি ডলার প্রায় ১২৩.১৩ টাকা ধরে)। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক খনি ও ইস্পাত কারখানা মিলিয়ে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছেন। কারখানাটি চালু হলে বছরে ১ কোটি টন ইস্পাত উৎপাদন করা সম্ভব হবে। ২০৩০ সালের দিকে সেখানে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির অর্থনৈতিক প্রভাবের কথাও তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, কারখানা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের সময় সর্বোচ্চ ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কারখানা ও খনিতে স্থায়ীভাবে প্রায় ২ হাজার মানুষের চাকরি হবে।
ট্রাম্পের দাবি, পুরো প্রকল্পের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে। তিনি আরো বলেন, এই প্রকল্পে অঙ্গরাজ্য সরকারের কোনো কর ছাড় থাকছে না। কম্পানিটি এমন কিছু নিশ্চয়তা পেয়েছে, যা সরকার পরিবর্তন হলেও কার্যকর থাকবে। ট্রাম্প বলেন, আগামী ১০ বছরে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারখানাটি গড়ে তোলা হবে। সেখানে উন্নতমানের ও তুলনামূলক কম খরচে ইস্পাত উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি ইস্পাতের ওপর আরোপ করা ৫০ শতাংশ শুল্কের কথাও অনুষ্ঠানে উঠে আসে।
ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, এই শুল্ক বিদেশি কম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক বলেন, এই শুল্ক না থাকলে মিনেসোটায় খনি এবং আইওয়ায় ইস্পাত কারখানা তৈরি হতো না। ট্রাম্প বলেন, কম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা তৈরি করছে, কারণ তারা শুল্ক দিতে চায় না। তবে এই শুল্ক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইস্পাত রপ্তানিকারকদের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। ভারতও এর মধ্যে রয়েছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় ইস্পাত উৎপাদক দেশ।
মেসাবি মেটালিকসের এই বিনিয়োগের ফলে ভারতে উৎপাদিত ইস্পাত যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে শুল্ক দেওয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রেই ইস্পাত উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। ইস্পাত কারখানাটি বেসরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হবে। তবে মিনেসোটার লৌহ আকরিক খনির অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক সহায়তা করেছে।
কম্পানির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের দিকে নতুন কারখানায় ইস্পাত উৎপাদন শুরু হতে পারে। মেসাবি মেটালিকস ভারতের বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী এসার গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শাখা। শশী রুইয়া ও রবি রুইয়া দুই ভাই মিলে এসার গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার ইতিহাস প্রায় পাঁচ দশকের। ২০০৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় এসারের কার্যক্রম রয়েছে। ওই বছর তারা মিনেসোটা স্টিল কিনে নেয়। কম্পানিটির নিয়ন্ত্রণে ১৪০ কোটি টনের বেশি লৌহ আকরিকের মজুত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ভারতে এসার গ্রুপের বড় শিল্পপ্রকল্পগুলোর মধ্যে গুজরাটের হাজিরায় একটি বড় ইস্পাত কারখানা রয়েছে। কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১ কোটি টন।
এ ছাড়া গুজরাটের ভাদিনারে এসারের একটি বড় তেল শোধনাগার রয়েছে। যুক্তরাজ্যে শেল কম্পানির স্ট্যানলো শোধনাগারও কিনেছে এসার। বিদেশে সৌদি আরবে কম কার্বন নিঃসরণকারী ইস্পাত কারখানা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের চার সপ্তাহেরও কম সময় আগে এই বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হলো। অনুষ্ঠানে আইওয়ার কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর প্রশংসা করেন ট্রাম্প। সাম্প্রতিক কিছু জনমত জরিপ নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। কাছাকাছি ব্যবধানের এসব জরিপকে ট্রাম্প ‘ভুয়া’ বলে উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে কানাডা, ইরান ও চীন নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব শিগগিরই’ যুদ্ধে জয়ী হবে। একই সঙ্গে কানাডার সঙ্গে একটি ন্যায্য বাণিজ্য চুক্তি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন ইস্পাত কারখানার এই প্রকল্পকে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশটির শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে খনি থেকে ইস্পাত উৎপাদন পর্যন্ত একটি বড় সরবরাহ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই গড়ে উঠবে।
0 মন্তব্য