শেরপুরের সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত দুই গ্রাম রাংটিয়া ও বাঁকাকুড়া। এই দুই গ্রামে বসে ব্যতিক্রমী দুই হাট। ব্যতিক্রমী এই অর্থে যে এ দুটি হাট অন্য সব গতানুগতিক হাটের মতো নয়। হাটগুলোতে বিকিকিনি হয় শুধু পিঁপড়ার ডিম। হাটগুলো প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে পিঁপড়ার ডিমের বেচাকেনা। এই হাটে আসেন নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও জামালপুরের বকশীগঞ্জের পিঁপড়ার ডিম বিক্রেতারা।
গারো পাহাড়ের শাল-গজারি বন এলাকা থেকে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করে প্রতিদিন হাটে আসেন তাঁরা। ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা কেজি দরে এই ডিম কিনে নেন পাইকাররা। পরে এসব ডিম এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে বলে জানান ডিম কিনতে আসা পাইকার দুলাল মিয়া (৪৫)। মূলত বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন এমন শিকারিরাই পিঁপড়ার ডিমের প্রধান ক্রেতা।
মাছ ধরার প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিভিন্ন সময় এসব ডিমের বেশ চাহিদা থাকে।
এই পিঁপড়ার ডিম বেচেই চলছে নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতি ও শ্রীবরদী পাহাড়ি এলাকার প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিক পরিবার। রাংটিয়া গ্রামের ডিম সংগ্রহকারী মিঠুন কোচ বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাহাড়-জঙ্গল ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করি ডিম। সারা দিনে ৩০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ করতে পারি। কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় বিক্রি করি।
এই টাকাতেই আমার সংসার চলে।’
একই এলাকার ডিম সংগ্রহকারী হোসেন আলী (৪০) বলেন, ‘প্রতিদিন একই পরিমাণ ডিম পাই না, কোনো দিন একশ থেকে দেড় শ গ্রাম ডিম পাই। কী করব, সেটা বেচেই সংসারের জন্য সদাই কিনি। পাহাড়ি এলাকায় কোনো কাজকাম নাই। তাই এই কাজই করি এখন।’
একই গ্রামের মিলন কোচ ও অলিন কোচ কোচ জানান, গাছ থেকে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করতে খুব কষ্ট হয়। সাপ-বিচ্ছু, মৌমাছি আর হাতির ভয় থাকে। পিঁপড়ার কামড় খেতে হয়। তবু টাকার জন্য এ কাজ করতে হয় তাঁদের।
রাংটিয়া এলাকার সমাজসেবী একেন্দ্র কোচ জানান, পাহাড়ে এখন তেমন কোনো কাজ নেই। কৃষিকাজে বেতন ৪০০ টাকা আর এক কেজি ডিমের দাম এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। ডিম বেচেই লাভ বেশি বলে এই পেশায় আগ্রহ বেশি। স্থানীয় নেতা শুক্কুর আলী জানান, শুধু নকশি এবং রাংটিয়া এলাকায়ই প্রায় একশ শ্রমিক এই পেশার সঙ্গে জড়িত।
গজনি, বাঁকাকুড়া, মধুটিলাসহ পুরো সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই শতাধিক শ্রমিক পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে সারা বছর পাওয়া যায় না পিঁপড়ার ডিম। শীত ও বর্ষার সময় মূলত একশ্রেণির বড় আকারের লাল পিঁপড়া বনাঞ্চলের শাল-গজারি গাছের মগ ডালের পাতা ও গাছের খোরলের (গর্ত) মধ্যে বাসা তৈরি করে। সেখানেই ডিম পাড়ে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাহাড়ি শাল-গজারি বনে এবং আম, জাম, লিচুগাছসহ বিভিন্ন গাছ থেকে বাঁশের আগায় জাল দিয়ে ঠোঙা তৈরি করে এসব ডিম সংগ্রহ করা হয়।
তবে এভাবে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করার ক্ষতিকর দিকও আছে। শেরপুর বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং প্রকৃতি ও পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ হিউম্যানিটি, ইন্টারাপ্টেড নেচার অ্যান্ড এনভাইরনমেন্টের (শাইন) নির্বাহী পরিচালক মো. মুগনিউর রহমান মনি বলেন, ‘শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের বিশাল এলাকাজুড়ে লোকজন পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করছে। এতে করে এই পাহাড়ি এলাকার খাদ্য শৃঙ্খল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই পিঁপড়ার ডিমের ওপর নির্ভরশীল ছোট-বড় পাখি ও প্রাণী এই বনে আর টিকতে পারবে না। পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহের এই ধারাবাহিকতা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে গারো পাহাড় পাখি ও প্রাণিশূন্য হতে বেশি সময় লাগবে না, যা আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে।’
0 মন্তব্য