অভাব-অনটনের সংসার। বাবা ইমারত নির্মাণশ্রমিক, মা একটি এনজিও অফিসের আয়া। কখনো বাবার কাজ থাকে, কখনো থাকতে হয় বেকার। মায়ের সামান্য বেতনে চলে সংসার। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেনি পড়াশোনা। বাবা-মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে এসএসসির পর এবার এইচএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার মো. মোন্নাফ হোসেন (মুন্না)। এখন তাঁর স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষিত হওয়া এবং একদিন বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো।
মুন্না এবার সরকারি বেগম নুরুন্নাহার তর্কবাগীশ অনার্স কলেজের বাণিজ্য বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালে ধানঘরা মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কোনো কোচিং সেন্টারে পড়ার সুযোগ না পেলেও নিজের অধ্যবসায় ও বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় এই সাফল্য অর্জন করেছেন মুন্না।
মুন্নার বাবা রফিকুল ইসলাম পেশায় একজন ইমারত নির্মাণশ্রমিক। মা মোছা. মিরা খাতুন একটি এনজিও অফিসে আয়ার কাজ করেন। সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে দীর্ঘদিন ধরেই সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাঁদের। মায়ের সামান্য বেতন আর বাবার অনিয়মিত আয়ের মধ্যেই চলেছে মুন্নার লেখাপড়া।
মুন্নার মা মোছা. মিরা খাতুন বলেন, ‘ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করব—এটাই আমার স্বপ্ন। এনজিও অফিসে আয়ার কাজ করে মাসে মাত্র ৬ হাজার টাকা বেতন পেতাম। সংসারে অভাব-অনটন ও ঋণ রয়েছে। তারপরও নিজের প্রয়োজন কমিয়ে ছেলের পড়াশোনার পেছনে টাকা খরচ করেছি। ছেলের এই ফলাফলে আমাদের সব কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছে।’
বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইমারত নির্মাণের কাজ সব সময় থাকে না। কোনো দিন কাজ পাই, আবার কোনো দিন বাড়িতে বসে থাকতে হয়। অভাবের সংসার হলেও ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন কখনো ছাড়িনি। ছেলে ভালো ফল করেছে, এতে আমরা অনেক খুশি।’
নিজের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের অবদানের কথা স্মরণ করে মো. মোন্নাফ হোসেন মুন্না বলেন, ‘আমার বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। তাঁদের কষ্ট আমি কাছ থেকে দেখেছি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেতে চাই। সেখানে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে বাবা-মায়ের জন্য কিছু করতে পারব—এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।’
দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মুন্নার এই সাফল্য তাঁর অধ্যবসায় এবং বাবা-মায়ের ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এসএসসি ও এইচএসসিতে ধারাবাহিকভাবে জিপিএ-৫ অর্জনের পর এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন দেখছেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চান মুন্না।
0 মন্তব্য