ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গতকাল রবিবারও সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিপেটা ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ওই সব এলাকার পাঁচ শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
এর মধ্যেই গতকাল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলছে, ঢাকা ও গাজীপুরে সহিংস শ্রমিক বিক্ষোভে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যুক্ত রয়েছেন। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সাজমুল ইসলাম একটি মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
সেখান থেকে আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মিরপুর থেকেও এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার ঘটনায় অন্তত ৫০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত থাকলে কারখানা বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মালিকরা।
অন্যদিকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী কারখানা চালু রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জননিরাপত্তা ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্ব্বয়ক শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
শিল্প পুলিশ বলছে, ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করার সময় সাভার ও আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় এক দিনের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে তারা জানতে পেরেছে।
এসব ঘটনায় অভিযান চালানোর বিষয়ে গতকাল বিকেল পর্যন্ত মিরপুরে ২৯ জন এবং গাজীপুরে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা পুলিশের গাড়িতে হামলা, আগুন, সড়ক আবরোধ ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী রয়েছেন।
যানবাহন চলাচলে বাধা
পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে রাজধানীর মিরপুর এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের স্থানে স্থানে যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। কোথাও কোথাও পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদুনে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসহ সংশ্লিষ্ট সড়কে প্রায় ছয় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শ্রমিকরা তিনটি প্রধান দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন। এর মধ্যে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিটি অন্যতম।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র যা বলছে
সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গতকাল সকাল থেকে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, গাজীপুরের কোনাবাড়ী, সফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন শ্রমিকরা। এ সময় মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক-পুলিশ দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। দুপুরের দিকে এসব এলাকা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। এক পর্যায়ে উত্তেজিত শ্রমিকরা পুলিশের গাড়িতে আগুন দেন। পুলিশ বক্স এবং কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, আন্দোলনের এক পর্যায়ে কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকার বেশির ভাগ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, শ্রমিকরা বিকেল ৩টার দিকে মহাসড়ক ছেড়ে চলে যাওয়ার পর যানবাহন চলাচল শুরু হয়। আশপাশের পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হয়।

মিরপুরে সংঘর্ষে পুলিশের গাড়িতে আগুন
গতকাল সকাল থেকে দফায় দফায় রাজধানীর মিরপুর এলাকায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের গাড়িতে আগুন দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
এদিন সকাল ৯টার দিকে মিরপুর ১১ নম্বর এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েক শ পোশাক শ্রমিক মেট্রো স্টেশনের নিচে সড়ক অবরোধ করে রাখেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় পথচারী, নারী-শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের। ওই স্টেশনের পাশেই বেশ কয়েকটি হাসপাতাল রয়েছে। অবরোধের কারণে হাসপাতালে আসা অসুস্থ ব্যক্তিদের পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। সকাল ১১টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় দেখা যায়, পোশাক শ্রমিকরা মোড়টির একাংশ দখল করে নেন। ওই সময় মিরপুর ১ নম্বর থেকে ৩০-৪০ জন তরুণ লাঠি হাতে মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার দিকে এলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়, যা দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত চলে। পুলিশের পক্ষ থেকে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিপেটা করা হয়। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, পোশাক শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণের জন্য এরই মধ্যে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। তবু শ্রমিকরা ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে ভাঙচুর করেন। জনভোগান্তি কমাতে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়।
আগুন নেভাতে গিয়ে হামলার শিকার ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, চালক আহত
রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রো রেল স্টেশনের নিচে পুলিশের গাড়িতে দেওয়া আগুন নেভাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। এ সময় ইটপাটকেলের আঘাতে গাড়িটির সামনের উইন্ডশিল্ড ও দুই পাশের লুকিং গ্লাস ভেঙে যায়। ভাঙা কাচের আঘাতে আহত হন গাড়ির চালক।
মেট্রো রেলের ৩ স্টেশন বন্ধ ছিল আড়াই ঘণ্টা
মিরপুর ১০, ১১ ও পল্লবী মেট্রো রেল স্টেশন গতকাল বন্ধ ছিল আড়াই ঘণ্টা। ট্রেন চলাচল করলেও দুপুর ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত এই তিন স্টেশনে ট্রেন থামেনি, যাত্রীও ওঠানামা করেনি। আড়াইটার পর এসব স্টেশনে ট্রেন থামে, যাত্রীরা ওঠানামা করে। তবে সব গেট খুলে দেওয়া হয়নি; কিছু কিছু গেট বন্ধ ছিল।
মিরপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ১১ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার
পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের আড়ালে নাশকতা ও ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির ভাষ্য, মিরপুর ১০ নম্বর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবি মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকতা চালান। এ সময় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে শ্রমিক লীগের একজন নেতা, আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য এবং যুবলীগের একজন কর্মী রয়েছেন। তাঁরা হলেন মো. কামাল গাজী, মো. ওলিউল্লাহ অনিক, আলিফ হোসেন ইমন, মো. নাহিদ হাসান, আরিফ আকন্দ, জায়েদ করিম রিয়াজ, মো. রমজান সরকার, মোয়াজ্জেম শাহরিয়া নিয়াজ, জুবায়েদ ইসলাম জিসান ও মো. মাহিম মোল্লা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাত্রলীগের অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিও
শ্রমিকদের এই আন্দোলনের মধ্যে প্রবেশ করে অংশ নেন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতারা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজবুল ইসলাম। তিনি অংশ নেন কালিয়াকৈর শিল্পাঞ্চল এলাকায়। একই সঙ্গে তিনি নিজেই বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে জানিয়েছেন যে শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন; এবং নিজেকে পোশাক শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধের পর ফের শ্রমিকদের বিক্ষোভ
গতকাল অবরোধ চলাকালে গাজীপুর মহাসড়কে শ্রমিকরা ১৫-২০টি কারখানা ও ১০-১২টি যানবাহন ভাঙচুর করেন। কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এতে পুলিশসহ শতাধিক শ্রমিক আহত হন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা চন্দ্রায় পুলিশের গাড়িতে ও কোনাবাড়ীতে পুলিশ বক্সে এবং পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল নিটেক্স কারখানার ফ্যাব্রিকসের গোডাউনে আগুন ধরিয়ে দেন। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয় পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিকেলে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুপুর আড়াইটার পর পুরো গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ স্বাভাবিক হয়।
কালিয়াকৈরে সংঘর্ষ
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার ট্রপিক্যাল নিটেক্স কারখানার গোডাউন ও পুলিশের একটি ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করেছে দুবৃত্তরা। এ ছাড়া ভাঙচুর করা হয় কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং যমুনা ব্যাংকের পল্লী বিদ্যুৎ শাখার বাইরের গ্লাস। সড়কের ওপর টায়ারে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় সড়কের যান চলাচল। শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় পুলিশ, সাংবাদিক, শ্রমিক, পথচারীসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়। পরে বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ, বিজিবি, আনসার সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস শেল ছুড়ে এবং লাঠিপেটা করে সড়ক থেকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় সকাল থেকেই উপজেলার অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
উত্তাল আশুলিয়া, অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিক ছাঁটাই ও কালো তালিকাভুক্তি বন্ধের দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল। গতকাল সকাল থেকে কয়েকটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে তাঁরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করলে শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে নিরাপত্তার স্বার্থে আশুলিয়ার অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশের সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে একই দাবিতে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন একেএইচ গার্মেন্টসের শ্রমিকরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সকাল থেকেই কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করছেন। তাঁদের আন্দোলনের মুখে নিরাপত্তার স্বার্থে অর্ধশতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে শ্রমিকদের বিক্ষোভ
বিভিন্ন দাবিতে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি ফেলে বিক্ষোভ মিছিল করছেন শ্রমিকরা। এতে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত থাকলে কারখানা বন্ধের হুঁশিয়ারি মালিকদের
মজুরি বোর্ড গঠনের পরও ন্যূনতম বেতনের দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের অসন্তোষ ও সহিংসতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকরা। শ্রমিকদের ন্যূনতম নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দিনই গতকাল মালিকদের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এসেছে। এদিকে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ।
চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে গতকাল রবিবার রাজধানীর বিজিএমইএ ভবনে সদস্যদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিতভাবে কারখানা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সকালে কারখানা খোলা হচ্ছে, কিন্তু এক ঘণ্টা পরই আবার বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। আমরা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই।’
বিজিএমইএ সভাপতি শ্রমিক সংগঠন ও ফেডারেশনগুলোকে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহবান জানান। একই সঙ্গে শ্রমিক কিংবা মালিক—যে পক্ষই আইন নিজের হাতে তুলে নেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।
বৈঠকে বিজিএমইএর প্রায় ২৩৫ জন সদস্য অংশ নেন। তাঁদের প্রতিনিধিত্বে ৬০০ থেকে ৭০০ কারখানা রয়েছে বলে জানান মাহমুদ হাসান খান।
নতুন মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিক ও শিল্প সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধরার আহবানও জানান তিনি।
সূত্র জানিয়েছে, চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার কারণে মিরপুর, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৫২৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করায় সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এক বিবৃতিতে বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা যে চাপের মধ্যে রয়েছেন, তা মালিকরাও উপলব্ধি করেন। তবে বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানিসংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জও বাস্তব।’
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘শ্রমিক ও শিল্প একে অপরের পরিপূরক। উভয় পক্ষ ভালো থাকলে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাবে। তাই সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাধানে পৌঁছতে হবে।’
0 মন্তব্য