নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানায়, ভূমিকম্পটি বিপর্যয়ের কারণ নয়; বরং বিশাল বরফ ও পাথরের ধসের অভিঘাতই ভূকম্পনযন্ত্রে ধরা পড়েছিল। এরপর সেই ধস থেকেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ।
হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ে
লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে, নেপাল-চীন সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে। ২৪ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবিতে হিমবাহের প্রান্ত অক্ষত দেখা গেলেও ২৬ আগস্টের ছবিতে সেখানে বড় একটি অংশ অনুপস্থিত এবং নিচে ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ হাজার ১২৭ মিটার উচ্চতায় এই ধসের ঘটনা ঘটে এবং ভাঙনের বিস্তার ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪ কিলোমিটার। তবে ঠিক কী কারণে ওই দিন হিমবাহের অংশটি ভেঙে পড়ল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ধস থেকে ভয়াবহ স্রোত
শত শত মিটার ওপর থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ নিচে পড়ে গুঁড়িয়ে যায়। এরপর মাটি, পাথর ও বরফের সঙ্গে মিশে তা ভয়াবহ ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পরিণত হয়। নতুনভাষা শেখার রিসোর্স ব্যবহার করা
চীনা সরকারের ভূতত্ত্ববিদ গুয়ো ঝাওচেং রয়টার্সকে জানান, স্রোতটির গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার বা সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার। এটি ২০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করে লহেন্দে খোলা নদীর দিকে নেমে যায়। এত দ্রুতগতির কারণে এর পথে থাকা মানুষদের সতর্ক হয়ে সরে যাওয়ার প্রায় কোনো সুযোগই ছিল না।
সীমান্ত পেরিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ
ধ্বংসাবশেষের স্রোতের পথে প্রথম বড় স্থাপনা ছিল গিরং বন্দরের সীমান্ত অবকাঠামো। সেখানে নেপাল ও চীনের কাস্টমস ও অভিবাসন ভবন এবং একটি সেতু রয়েছে।
সীমান্ত এলাকার নজরদারি ক্যামেরায় দেখা যায়, পাহাড়ি গিরিখাত দিয়ে নেমে আসা বাদামি রঙের বিশাল স্রোত বন্দরের স্থাপনা ও আশপাশের মানুষকে গ্রাস করছে। পরবর্তী স্যাটেলাইট বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ওই এলাকার প্রায় সব স্থাপনাই ধ্বংসাবশেষের পথে পড়ে।
১০০ কিলোমিটার পথে বদলে যায় বিপর্যয়ের ধরন
সীমান্ত পার হওয়ার পর ধ্বংসাবশেষের স্রোত নদীতে প্রবেশ করে। তখন এটি ধীরে ধীরে বন্যার রূপ নেয়। প্রায় ৫ হাজার ১২৭ মিটার উচ্চতা থেকে স্রোতটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ৪ হাজার ৫০০ মিটারের বেশি নিচে নেমে আসে।
এই পথে তিমুরে, সিয়াপ্রুবেশি, হাকুবেশি, বেত্রাবতী, ত্রিশূলী ও দেবীঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত স্রোত ৫০০ মিটারেরও কম উচ্চতায় কোলপুরতার এলাকায় পৌঁছায়। নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ান জেলাতেও এর প্রভাব পড়ে।
রয়টার্সের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব এলাকায় শত শত স্থাপনা ধ্বংসাবশেষের পথে পড়ে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ লাইন ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ICIMOD) জানিয়েছে, এই প্রবাহ ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নেমে যায়। গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।
নতুন দুটি হ্রদ, বাড়ছে নতুন ঝুঁকি
বিপর্যয় এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সীমান্তের কাছে ধ্বংসাবশেষ নদীর গতিপথ আটকে দুটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি করেছে—একটি নেপাল ও অন্যটি চীনের অংশে। দুই দেশই সতর্ক করেছে, এসব হ্রদের পানি বাঁধ ভেঙে হঠাৎ নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।
এরই মধ্যে একটি হ্রদ উপচে পড়তে শুরু করেছে। পরিস্থিতির কারণে উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়েছে। দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি বের করে দেওয়াও কঠিন বলে জানিয়েছেন নেপালের কর্মকর্তারা। ফলে আপাতত হ্রদগুলোর ওপর নজরদারিই প্রধান ব্যবস্থা। নতুনভাষা শেখার রিসোর্স ব্যবহার করা
কেন ভেঙে পড়ল হিমবাহ?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। গবেষকদের মতে, উচ্চ পার্বত্য এলাকায় উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বরফ ও পাথরের স্থিতিশীলতা কমে যেতে পারে। বরফ সরে গেলে খাড়া ঢালের ওপর থেকে প্রাকৃতিক চাপ কমে, বরফ গলার পানি বাড়ে এবং বরফ জমা ও গলার পরিবর্তিত চক্র পাহাড়ের গঠন দুর্বল করতে পারে।
তবে গবেষকরা এই নির্দিষ্ট ধসকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে চূড়ান্তভাবে দাবি করেননি। কোনো একটি ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। স্থানীয় কোনো ফাটল, গলিত পানির চাপ কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ঢালের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়াও এর তাৎক্ষণিক কারণ হতে পারে।
অর্থাৎ, ২৬ আগস্ট ঠিক কী কারণে ধসের সূত্রপাত হয়েছিল, তা এখনো অজানা। তবে যে পরিবেশে এমন ঘটনা ঘটেছে, সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ ও পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কেন এত ভয়াবহ হলো ক্ষয়ক্ষতি?
এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতার পেছনে প্রধানত তিনটি বিষয় কাজ করেছে—স্রোতের গতি, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও ঘটনার সময়।
প্রথমত, ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার গতির স্রোত থেকে পালানোর সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল। দ্বিতীয়ত, হিমালয়ের সরু উপত্যকায় নদী, সড়ক, বসতি ও বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো একই এলাকায় গড়ে ওঠায় বিকল্প পথে সরে যাওয়ার সুযোগ কম। তৃতীয়ত, ধসের আগে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের কোনো সংকেত ছিল না। ফলে সাধারণ বন্যার মতো আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার সুযোগও ছিল সীমিত।
এর পাশাপাশি নতুন সৃষ্ট হ্রদগুলোও এখন বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলোর কোনোটি ভেঙে গেলে প্রথম ধসের পর আরও একটি আকস্মিক বন্যা তৈরি হতে পারে।
তবে ঘটনার চূড়ান্ত প্রাণহানি, নতুন দুটি হ্রদের পানি ও গভীরতা এবং ধসের পর পাহাড়ের ঢালগুলো আগের তুলনায় কতটা অস্থিতিশীল হয়েছে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য ও পর্যালোচনা প্রয়োজন।
সূত্র: সামা টিভি
0 মন্তব্য