কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং সততার মাধ্যমে কঠিন সময় ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ঘুরে দাড়িয়েছেন বহু নারী। আর এমনই এক নারী হলেন, নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার খাদিজা আক্তার। অকালে স্বামীকে হারিয়ে নিজের মেধা, শ্রম এবং সাহসের জোড়ে একজন সফল নারী কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন তিনি।
জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন খাদিজা আক্তার। সংসারের হাল আর দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে তাকে। জীবনযুদ্ধের কঠিন এ লড়াইয়ে দুই ছেলেকে পার করিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি।
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী সুনগর গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন পাঁচ বিঘা জমিতে কফি, রামবুটান, কোকো, ড্রাগন ও প্যাশন ফলসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন খাদিজা আক্তার। এরইমধ্যে এসব গাছ থেকে ফল আসতে শুরু করেছে। এ বাগানের ফল বিক্রি করে খরচ বাদে বছরে আয় পাচ্ছেন সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা।
খাদিজা আক্তার জানান, বাগানের সব গাছ ফল দেওয়া শুরু করলে দিন দিন আয়ের পরিধি বাড়বে।
জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের মৌজা শৌলমারী সুনগর গ্রামের খাদিজা আক্তারের বাড়ি। ২০১৪ সালে হৃদরোগসহ নানা জটিলতায় স্বামী নজরুল ইসলামের মৃত্যু হলে তিনি পড়েন বিপাকে। স্বামীর রেখে যাওয়া ব্যবসা আর জমির ফসল ছিল পরিবারের চলার একমাত্র ভরসা। এসময়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বড় ছেলে আর এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছোট ছেলের ভবিষ্যৎ লেখাপড়া নিয়ে অন্ধকার দেখতে শুরু করেন তিনি। কিন্তু তার সাহসিকতায় পার করেছেন সকল প্রতিকূলতা।
স্থানীয় কৈমারী বাজারে থাকা স্বামীর স্টেশনারী ব্যবসা কঠোর পরিশ্রম করে সামলিয়েছেন। পাশপাশি অদম্য মেধা, শ্রম কাজে লাগিয়ে তিনি এখন একজন সফল নারী কৃষি উদ্যোক্তা। ইতিমধ্যে নারী কৃষি উদ্যোক্তার স্বীকৃতিতে পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার।
সম্প্রতি কথা হলে তিনি বলেন, এতো কষ্ট করতে হবে, তা আগে কখনো ভাবিনি। এখন পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, কীভাবে এত কিছু করেছি। সংসার, সন্তান আর ব্যবসা-সবই আমাকে একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে।
এ বিষয়ে খাদিজা বলেন, ‘আমার স্বামী মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, ছেলেদের নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। আর সে স্বপ্ন পূরণে বড় ছেলে মো. আখতারুজ্জামান নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ এবং ছোট ছেলে সেফায়েত নামরাত গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অনুষদে মাস্টার্স সম্পন্ন করিয়েছি। বর্তমানে বড় ছেলে একটি বেভারেজ কোম্পানির জ্যেষ্ঠ এক্সিকিউটিভ কর্মকর্তা। ছোট ছেলে ২০২৫ সালে মাস্টার্স পাশের পর চাকুরির প্রস্তুতির পাশপাশি করছেন মায়ের বাগানের কাজে সহযোগিতা। ছেলেদেরকে উচ্চশিক্ষিত করতে পেরেছি-এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।
যেভাবে খাদিজা সফল কৃষি উদ্যোক্তা:
২০১৮ সালে কৃষিতে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেন খাদিজা। কফি তার পছন্দের পানীয় হওয়ায় বড় ছেলের পরামর্শে বাড়ি সংলগ্ন পতিত জমি পরিষ্কার করে শুরু করেন কফি চাষ। পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ উপজেলা থেকে অ্যারাবিকা জাতের কফির চারা এনে রোপণ করেন বাগানে। এরপর পর্যায়ক্রমে রামবুটান, কোকো, ড্রাগন ও প্যাশন ফ্রুটসহ বিভিন্ন বিদেশি ফল সংযোজন করেন বাগানে। তিন বছরের মধ্যে ফল দিতে শুরু করে এসব গাছ। পাশাপাশি শুরু করেন রঙিন মাছের পোনা উৎপাদন।
খাদিজা বলেন, ‘একদিকে স্বামীর ব্যবসা, অন্যদিকে আমার বাগান করা। এ নিয়ে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে। বাগান করার সময়েও অনেকে নানা কথা বলেছে। কিন্তু কখনো আমি পেছনে ফিরে তাকাইনি’।
পাঁচ বিঘার বাগানে বহুমুখী উদ্যোগ:
খাদিজার প্রায় পাঁচ বিঘার বাগানে নেওয়া হয়েছে বহুমুখী উদ্যোগ। এরমধ্যে তিন বিঘায় কফি এবং দুই বিঘায় রামবুটান, ড্রাগন ফল, প্যাশন ফ্রুট, কোকোসহ বিভিন্ন ফলের গাছ রয়েছে।
বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফলের গাছ। বাড়ির প্রবেশ পথে মাচায় ছড়িয়ে আছে প্যাশন ফ্রুটের লতা। এক পাশে পুকুর, অন্য পাশে ফলের বাগান। বাড়ির আঙিনায় রয়েছে আম, লিচু, তেঁতুল, তেজপাতাসহ বিভিন্ন গাছ। পাশাপাশি রয়েছে রঙিন মাছের পোনার উৎপাদন ব্যবস্থা।
খাদিজা জানান, বাগান করার কয়েক বছরের মধ্যেই ফলন পেতে শুরু করেন। প্রায় ছয় বছর ধরে কফি বাজারজাত করছেন তিনি। গত বছর প্রতি কেজি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা দরে প্রায় ৪০০ কেজি রামবুটান বিক্রি করেছেন। চলতি বছর তিনটি গাছ থেকে পেয়েছেন প্রায় ৮০ কেজি ফল।
তিনি জানান, বাগান থেকে প্রতিবছর খরচ বাদে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় হচ্ছে। কফি প্রতি কেজি দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া চলতি বছর রঙিন মাছের পোনা বিক্রি হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার।
নার্সারিতেও সফল খাদিজা:
ফল উৎপাদনের পাশাপাশি তার নার্সারিতে ২ হাজার ৫০০টি কফির চারা, ৩০০টি রামবুটানের চারা এবং ২০০টি কোকো ফলের চারা রয়েছে। তিনি এসব চারা অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করছেন। তার এ উদ্যোগের সহযোগিতা করছেন কৃষিবিদ ছোট ছেলে সেফায়েত নামরাত।
ছোট ছেলে সেফায়েত নামরাত বলেন, অবসর সময়ে মায়ের সঙ্গে বাগানের পরিচর্যা ও অনলাইনে ফল এবং চারা বিক্রির কাজে সহযোগিতা করছি। ভবিষ্যতে আমাদের বাগান আরও সম্প্রসারণ করতে চাই।
খাদিজা আক্তার কঠোর শ্রম ও মেধা খাটিয়ে টিকিয়ে রেখেছেন স্বামীর ব্যবসা এবং কৃষি জমি। নিজ আয় থেকে এ পর্যন্ত কিনেছেন ৭৫ শতাংশ জমি। চলতি বছর তিনি জেলার সেরা নারী কৃষি উদ্যোক্তার পুরস্কার পেয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনের জন্য সম্মাননাও পেয়েছেন।
খাদিজা আক্তার বলেন, আমি চাই আমার মতো যেন নারীরা এগিয়ে আসতে পারেন। বাণিজ্যিক না হলেও যেন বাড়ির আসে পাশে পতিত জমিতে ফলের গাছ লাগিয়ে অন্তত তাদের পরিবারের ফলের চাহিদা পুরণ করতে পারেন।
এ বিষয়ে কৈমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাদেকুল সিদ্দিক বলেন, খাদিজা আক্তার একজন সংগ্রামী নারী। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একাই সংসার, ব্যবসা ও সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব সামলিয়েছেন। এখন তিনি একজন সফল নারী কৃষি উদ্যোক্তা। তাকে দেখে গ্রামের অনেকেই বাড়িতে দেশি-বিদেশি ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল বলেন, ‘কৃষির প্রতি খাদিজা আক্তারের আগ্রহ থেকেই তিনি কৃষি উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সময়ে তাকে পরামর্শ, উপকরণ, চারা ও যন্ত্রপাতি দিয়ে সহযোগিতা করেছে। তাকে দেখে এলাকার অন্য নারী ও পুরুষরাও কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
0 মন্তব্য