যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও যুদ্ধাবস্থায় ফিরে গেছে। কয়েক সপ্তাহ যুদ্ধ বিরতির পর আবারও পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় পাঁচজন নিহত ও কয়েক ডজন বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছে বলে অভিযোগ করে ইরান প্রতিবাদ জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টম্বর) মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে এক দফা হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার সিস্টেম, সামুদ্রিক সরঞ্জাম, মাইন পেতে রাখার সক্ষমতা এবং যোগাযোগ স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়।
ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন স্থানে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক হামলা হয়েছে হরমুজ প্রণালির আশপাশে। অনুমতি ছাড়া এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুমকি দিয়ে আসছে।
পাল্টা জবাবে ইরান জর্ডান ও ইরাকে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে বলে দেশটির সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। ইরানের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাহরাইনেও হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসি দাবি করেছে, জর্ডানে হামলায় বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। তবে রয়টার্সকে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী সেখানে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করেছে। এর মধ্যে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে এবং তিনটি প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পড়েছে। বাহরাইন জানিয়েছে, ইরানের বেশ কয়েকটি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় এরবিলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে তাদের স্থলবাহিনী সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং এতে কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। তবে ইরাক বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই এ হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
এই পাল্টাপাল্টি হামলা জুলাইয়ের পর প্রথম বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষ। এর মধ্য দিয়ে এমন একটি সময়ের অবসান ঘটল, যখন উভয় পক্ষই হামলা থেকে বিরত ছিল এবং একই সঙ্গে আলোচনায় ফিরতেও খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি।
এই বিরতির সময়টিতে সংঘাতের কারণে উভয় পক্ষই চাপে পড়েছিল। আগে থেকেই দুর্বল ইরানের অর্থনীতি যুদ্ধের কারণে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির প্রচলিত সামরিক সক্ষমতাও কমে গেছে।
অন্যদিকে, নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কংগ্রেস নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও চাপে রয়েছেন। রয়টার্স গত মাসে জানিয়েছিল, মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের অত্যন্ত নির্ভুল দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুতের বড় একটি অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। এতে ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ায়’ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তার কাছে অনেক বেশি ভালো মনে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ইরানিরা অনিবার্য পরিণতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে এবং ইরানের জনগণ কবে বিদ্রোহ করে লড়াই শুরু করবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই অঞ্চলে আমেরিকার আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে এর জবাব আরও কঠোর, বিস্তৃত ও ধ্বংসাত্মক হবে। যে কোনো দেশ আগ্রাসী মার্কিন বাহিনীকে সহযোগিতা করবে, তাদেরও এর বিপজ্জনক পরিণতি মেনে নিতে হবে।’
বিয়ের অনুষ্ঠানে নিহত ৫
যুদ্ধের অন্যতম বড় বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় এলাকা সিরিকের কাছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় পাঁচজন নিহত ও অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট।
মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে চার বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে। অন্যদিকে, প্রাদেশিক এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, আহতের সংখ্যা ৬৮ জন।
এই ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত মার্কিন কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই নিষ্ঠুরতাকে এর আগের নৃশংস ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।’ তিনি যুদ্ধের প্রথম দিন মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণের ঘটনায় ১৬০ জন নিহত হওয়ার ঘটনাটিও উল্লেখ করেন।
মিনাবের ওই হামলার বিষয়ে পেন্টাগন এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, পুরোনো ও হালনাগাদ নয়—এমন লক্ষ্য নির্ধারণের তথ্য ব্যবহারের কারণে ওই হামলা হয়ে থাকতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব ‘বর্বরোচিত অপরাধের’ কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
বিবৃতিতে ইরান আরও বলেছে, ‘যেসব সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এমন বর্বরতার মুখে নীরব থাকে কিংবা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের বুঝতে হবে—তাদের নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়। যারা আজ নীরব থাকবে, তারাও আগামীকাল এর পরিণতি থেকে রেহাই পাবে না।’
0 মন্তব্য