রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) জি এম নজরুল ইসলামকে প্রথম স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় গতকাল সোমবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।একই দিন তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর আগে হোটেলকক্ষে ভিডিওকাণ্ডে আলোচিত হন এই এমপি।
পুলিশ বলছে, স্পিকারকে জানিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের বাবা মাসুম বিল্লাহ সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গতকাল শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করেছেন। এতে এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়। এরপর ওই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দুপুরে আদালত তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড মঞ্জুরের পর গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে গতকাল বিকেলে পুলিশ হেফাজতে শেরেবাংলানগর থানায় নেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
এ সময় গাজী নজরুলের কাছে পুলিশ জানতে চায়, কিভাবে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হলো?
শেরেবাংলানগর থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, এ প্রশ্নে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। এরপর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীসহ তাঁরা ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে তিনজন থাকতেন জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এক মাস আগে ওই ফ্ল্যাটে ওঠেন। শুরুর দিকে তাঁরা তিনজনই এক কক্ষে থাকতেন। তবে মরিয়মকে ওই কক্ষের ফ্লোরে থাকতে হতো। এ নিয়ে আপত্তি জানান মরিয়ম। এরপর তাঁকে একটি আলাদা কক্ষ দেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, এমপি নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ‘তাঁর বাড়িতে কোনো কাজের মানুষ ছিল না। সব কাজ প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম করতেন।’ প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশ বলছে, দুই স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না।
ওসি বলেন, ‘তদন্তে সব ঘটনা বের হয়ে আসবে। ঘটনার সময় নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী এবং মরিয়ম একই বাসায় ছিলেন। নজরুল আমাদের কাছে দাবি করেছেন, তাঁরা তিনজনই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছেন। ঘটনার সময় তাঁরা দুজন পাশের কক্ষেই ছিলেন। অথচ তাঁরা কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন। আমরা বাসার সিসি ক্যামেরার তথ্য যাচাই করছি। কিছু চিরকুট পাওয়া গেছে। চিরকুটগুলো আসলে মরিয়মের লেখা কি না, তা এক্সপার্ট দিয়ে যাচাই করব।’
পুলিশ বলছে, বিয়ের পরও মরিয়ম এমপি নজরুল ইসলামকে ‘দাদুভাই’ বলে ডাকতেন। শ্যামনগরে প্রায় একই জায়গায় বাড়ি তাঁদের। এ তথ্য এমপি নিজেই জানিয়েছেন।
গতকাল গাজী নজরুলের ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘মরিয়ম বাবাকে দাদু বলেই সম্বোধন করতেন।’ পুলিশ বলছে, গত রবিবার রাতে রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে এমপি নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে এমপি নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। এর আগে সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে গত ২২ জুলাই গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াতে ইসলামী। বিরোধী দল এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে পরে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়।
এদিকে স্ত্রী হত্যা প্ররোচনা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত এই সংসদ সদস্যের পদ থাকবে কি না, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার কারণে সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে—এমন সরাসরি বিধান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে নেই।
তিন মাস ধরে বিতর্কে নজরুল : প্রবীণ এই রাজনীতিক (এমপি নজরুল ইসলাম) প্রায় তিন মাস ধরে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছেন। প্রথমে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এবং পরে দলীয় তদন্তে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী তাঁকে বহিষ্কার করে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়ে এরই মধ্যে তিনি তিনবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ভোটেও তিনি জয়ী হন।
মামলার এজাহারে যে অভিযোগ : মামলার এজাহারে মামলার বাদী মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেছেন, তিনি পেশায় একজন মুদি দোকানদার। তাঁর তিন মেয়ে। এর মধ্যে মরিয়ম (১৯) তাঁর বড় মেয়ে। গত জুন মাসে তাঁর শ্যালক ওবায়দুর রহমানের ‘প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়’ সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে তাঁর মেয়ের (মরিয়ম) বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর বাসায় নজরুল ও মাকছুদার সঙ্গে থাকত মরিয়ম।
এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এমপি নজরুল তাঁর মেয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তাঁর পরিবারকে বলে গেছে।
বাদী এজাহারে বলেন, গত রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এমপি নজরুল ফোন করে তাঁকে (মাসুম বিল্লাহ) দ্রুত তাঁর বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি মেয়ে মরিয়মকে ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখেন।
একাধিক নোটে যা লেখা : বাদী এজাহারে বলেন, লাশ উদ্ধারের সময় মেয়ের বিছানার ওপর তাঁর লেখা ‘সুইসাইড নোট’ দেখতে পান তিনি। এর মধ্যে একটি চিরকুটে লেখা আছে, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই, না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই।’
আরেকটি চিরকুটের বরাত দিয়ে এজাহারে লেখা, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তাঁর সাথে, জিততে পারিনি, হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমি তো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষে দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’
আরেকটি চিরকুটে লেখা, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী। কাগজে-কলমে অধিকার ছিল তার বউ-এর!!! আর আমি ছিলাম বোকা!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ!!!’ অন্য আরেকটিতে লেখা, ‘কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়, ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’
‘প্রকৃত দোষী যেন শাস্তি পায়’ : মামলার বাদী মরিয়মের বাবা এখন মেয়ে হারিয়ে পাগলপ্রায়। গতকাল সকাল থেকে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে মেয়ের লাশের জন্য বসেছিলেন মাসুম বিল্লাহ দম্পতি। মেয়েকে সদ্য হারিয়ে বাবা কখনো কাঁদছেন, কখনো শান্ত ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে। তিনি মর্গে বলেন, ‘বিয়ের পর নির্যাতনের কথা বলে মেয়ে আমার পা জড়িয়ে ধরে কানতো।’
মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমি তো চাই সঠিক তদন্ত, আমি যেন ন্যায়বিচারটা পাই। প্রকৃত দোষী যেন শাস্তি পায়।’
ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে পুলিশ মরিয়মের হাতে লেখা চিরকুট বলে যে কাগজগুলো উদ্ধারের কথা জানিয়েছে, জানতে চাইলে এ বিষয়ে মাসুম বলেন, ‘এগুলো ওর (মেয়ে) লেখা কি না সেটা আমি বলতে পারছি না।’
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে গতকাল দুপুরে মরিয়মের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে দাফনের জন্য তাঁর লাশ নেওয়া হয় সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গ্রামের বাড়িতে।
0 মন্তব্য