ফরিদপুরের শাবজানেসা মহিলা কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসাইনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, অর্থ আত্মসাৎ ও বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে অধ্যক্ষের অপসারণ দাবিতে মানববন্ধন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। রবিবার দুপুরে মাদরাসার সামনে সড়কে এ মানববন্ধন করেন তারা।
মানববন্ধনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষের কক্ষের টেবিলের ড্রয়ারে বিভিন্ন যৌন উত্তেজক ওষুধ ও সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। এছাড়া ফাজিল প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এবং আবাসিক হোস্টেলের সুপারের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলে দিনের পর দিন তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, অধ্যক্ষের কক্ষে হোস্টেলের দায়িত্বে থাকা এক শিক্ষার্থী নিয়মিত যাতায়াত করতেন। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আরো কয়েকজন ছাত্রীকে অনৈতিকভাবে স্পর্শ করার অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আরেক শিক্ষক বলেন, ‘একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি অভিভাবক। তিনি যদি রক্ষকের জায়গায় ভক্ষক হয়ে যান, তাহলে অধঃপতন হবেই। মেয়েরা নিরাপদ থাকছে না। তিনি এতিমদের হকও নষ্ট করছেন। এতিমদের খাবার ও বিভিন্ন জিনিস আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে।’
মাদরাসা সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালে ফরিদপুর শহরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকায় শাবজানেসা মহিলা কামিল মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। বর্তমানে আবাসিক সুবিধাসহ এখানে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী ও ৩০ জন শিক্ষক রয়েছেন।
২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ হিসেবে মো. আলমগীর হোসাইন যোগ দেন। এরপর থেকে বিভিন্ন বরাদ্দ ও অনুদান, টিউশন ফির অর্থ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত বলে মানববন্ধনে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, মাদরাসার সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কর্তৃক দুই দফায় দেওয়া ৩ লাখ টাকা, জেলা পরিষদের ২ লাখ টাকা, মন্ত্রণালয়ের অডিটের নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে উত্তোলন করা ১ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাদরাসায় অনুদানের জন্য প্রকাশনী কর্তৃক দেওয়া ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া বিএমএড প্রোগ্রামের বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, কোটেশন ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবই বিক্রিসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও করেন তারা।
শিক্ষকরা আরো অভিযোগ করেন, ফাজিল প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে চাকরি ও অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়েছে। গত ১৬ আগস্ট বিষয়টি শিক্ষার্থীরা হাতেনাতে ধরেন বলেও তাদের দাবি। এ ঘটনার পর একাধিক চ্যাটিং ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলে ওই অধ্যক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখান এবং লাঠি দিয়ে মারধর করেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
এরপর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ১৯ আগস্ট থেকে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের কাছে ছুটি নিয়ে মাদরাসা ছাড়েন অধ্যক্ষ। এরপর থেকে তিনি আর মাদরাসায় ফেরেননি বলেও জানান শিক্ষকরা।
এদিকে ১৯ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কাছে মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ দেওয়া হয়। পরে ২২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটিতে যান জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার শিক্ষা ও কল্যাণ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইনসানা তানজিন ইকো।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. মো. আমিনুল ইসলাম জানান, ওই সময় কর্মকর্তার উপস্থিতিতে অধ্যক্ষের কক্ষের টেবিলের ড্রয়ার থেকে বিভিন্ন যৌন উত্তেজক ওষুধ ও সরঞ্জাম পাওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন বরাদ্দের নথিপত্রও পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগকে ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেছেন অধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসাইন।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য আশিকুর রহমান বাচ্চুর সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। তাকে শোকজ করা হয়েছে এবং তিনি এর লিখিত জবাবও দিয়েছেন বলে জানান।
অধ্যক্ষ বলেন, ‘১৬ আগস্ট থেকে আমার কক্ষে তালা দেওয়া হয়েছে। আমি যেতেও পারিনি। এ সময় আমার কক্ষে ওষুধ কেন, অস্ত্রও রেখে দিতে পারত।’
শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অভিযোগগুলোর তদন্ত করে অধ্যক্ষকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মাদরাসার আর্থিক অনিয়ম ও অন্যান্য অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেন তারা।
0 মন্তব্য