সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ ও প্রযুক্তি কোম্পানি শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা, অভিভাবকের অনুমতি এবং বয়স যাচাইসহ নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে।
অস্ট্রেলিয়া
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে অস্ট্রেলিয়া। এর ফলে টিকটক, ইউটিউব, মেটার ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকসহ বড় প্ল্যাটফর্মগুলোতে ১৬ বছরের কম বয়সীরা প্রবেশ করতে পারবে না। বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে লক্ষ্য করে এটি বিশ্বের অন্যতম কঠোর বিধিনিষেধ।
নিয়ম না মানলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ মার্কিন ডলার) জরিমানা করা হতে পারে।
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্য আগামী বড়দিনের মধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা অনুমোদনের পরিকল্পনা করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত ১৫ জুন জানান, এই বিধিনিষেধ ২০২৭ সালের বসন্তের দিকে কার্যকর হতে পারে।
এ ছাড়া শিশুদের ফোনে নগ্ন ছবি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করার পরিকল্পনাও করছে ব্রিটেন। ৮ জুন স্টারমার বলেন, অ্যাপল ও গুগলের মতো কোম্পানিকে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটে শিশুদের নগ্ন ছবি শনাক্ত ও ব্লক করার প্রযুক্তি চালু করতে হবে। তবে বয়স যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্করা নগ্ন ছবি ধারণ, শেয়ার বা দেখতে পারবেন।
চীন
চীনের সাইবারস্পেস নিয়ন্ত্রক ‘মাইনর মোড’ নামে একটি ব্যবস্থা চালু করেছে। এতে ডিভাইস পর্যায়ে বিভিন্ন বিধিনিষেধ এবং অ্যাপভিত্তিক নিয়ম প্রয়োগ করা হয়। বয়স অনুযায়ী শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময়ও সীমিত করা হয়।
ডেনমার্ক
ডেনমার্ক গত নভেম্বরে জানিয়েছে, ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। তবে অভিভাবকরা চাইলে ১৩ বছর বয়স থেকে সন্তানদের নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবেন।
ফ্রান্স
গত ১৪ আগস্ট ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার একটি বিল আটকে দিয়েছে। আদালতের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে।
অনলাইন হয়রানি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ফরাসি পার্লামেন্ট গত জুলাইয়ে বিলটি অনুমোদন করেছিল।
জার্মানি
১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারে, তবে এজন্য অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন। শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, বর্তমান নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়।
গ্রিস
গ্রিস ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার খুব কাছাকাছি রয়েছে বলে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
ভারত
ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা গত জানুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণের আহ্বান জানান। তিনি প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় অনলাইনে ধরে রাখার কৌশলকে ‘শিকারি’ আচরণের সঙ্গে তুলনা করেন।
এর দুই দিন পর পর্যটননির্ভর রাজ্য গোয়া জানায়, অস্ট্রেলিয়ার মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে।
ইতালি
ইতালিতে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট খুলতে অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন। ১৪ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এই অনুমতি প্রয়োজন হয় না।
মালয়েশিয়া
মালয়েশিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নিবন্ধন ঠেকাতে শুরু করেছে। দেশটির যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত ১ জুন এ তথ্য জানিয়েছে।
নিউজিল্যান্ড
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। নিয়ম না মানলে প্ল্যাটফর্মগুলোর বৈশ্বিক আয়ের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ে যুক্তিসংগত পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে বিদ্যমান অ্যাকাউন্টের তথ্য, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবহারের মতো পদ্ধতি থাকতে পারে।
নরওয়ে
নরওয়ের সরকার ২০২৪ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের শর্তে সম্মতি দেওয়ার বয়স ১৩ থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করার প্রস্তাব দেয়। তবে বয়সসীমার নিচে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকরা তাদের হয়ে অনুমতি দিতে পারবেন।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য সর্বনিম্ন ১৫ বছর বয়স নির্ধারণে আইন প্রণয়নের কাজও শুরু করেছে দেশটি।
পোল্যান্ড
পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন দল ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে নতুন আইন তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে বয়স যাচাইয়ের দায়িত্ব প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্লোভেনিয়া
স্লোভেনিয়া ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি আইন তৈরি করছে বলে দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী মাতেই আরকন জানিয়েছেন।
স্পেন
প্রযুক্তি খাতের তীব্র লবিং সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও নিরাপদ করতে নতুন নিয়ম চালুর উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে স্পেন।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গত ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিলেন, ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
সুইডেন
সুইডেনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সর্বনিম্ন বয়স ১৫ বছর নির্ধারণ করা উচিত বলে গত ২ জুন সরকার নিয়োজিত একটি কমিশন সুপারিশ করেছে।
কমিশনের তদন্তকারী লিসা ইংলান্ড ক্রাফট বলেন, এমনভাবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা যেতে পারে, যাতে বয়স যাচাইয়ের দায়িত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর থাকে।
তুরস্ক
গত ২৪ এপ্রিল তুরস্কের পার্লামেন্ট ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও গেম সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
গত ১৮ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সর্বনিম্ন বয়স ১৫ বছর নির্ধারণ করে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর মাধ্যমে এমন পদক্ষেপ নেওয়া প্রথম আরব দেশ হয়েছে দেশটি।
এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট তৈরি বা ব্যবহার করতে পারবে না। পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মগুলোর পূর্ণাঙ্গ ফিচার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাদের ওপর বিধিনিষেধ থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র
শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে আরও দায়িত্বশীল করতে একটি মার্কিন বিল গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত ১২ মে রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ বিলটির প্রতি সমর্থন জানান।
‘কিডস অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট’ নামে প্রস্তাবিত এই আইনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে এমন ফিচার তৈরির ক্ষেত্রে ‘যুক্তিসংগত সতর্কতা’ অবলম্বন করতে হবে, যেগুলো শিশুদের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এটি দীর্ঘদিনের ‘চিলড্রেনস অনলাইন প্রাইভেসি প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ থেকে আলাদা। ওই আইনের আওতায় ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ করতে পারে না কোম্পানিগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অভিভাবকের অনুমতি বাধ্যতামূলক করে আইন করা হয়েছে। তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে এসব আইন আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন
গত ১২ মে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, ক্ষতিকর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফিচার থেকে শিশুদের সুরক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে চায়।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত ‘ডিজিটাল ফেয়ারনেস অ্যাক্ট’-এর আওতায় ‘আসক্তিকর ও ক্ষতিকর ডিজাইন পদ্ধতি’ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। আইনটি চলতি বছরের শেষের দিকে প্রস্তাব করার কথা রয়েছে।
এর আগে গত নভেম্বরে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। এতে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ভিডিও শেয়ারিং সাইট ও এআই কম্প্যানিয়ন ব্যবহারে ইউরোপজুড়ে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানানো হয়। আর ১৩ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অবস্থান
টিকটক, ফেসবুক ও স্ন্যাপচ্যাটসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খুলতে সাধারণত কমপক্ষে ১৩ বছর বয়স হতে হয়।
তবে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এই নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। ইউরোপের কয়েকটি দেশের সরকারি তথ্যেও দেখা গেছে, ১৩ বছরের কম বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে।
তথ্যসূত্র: জেরুজালেম পোস্ট
0 মন্তব্য