পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েক দিনের অস্থিরতার পর শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে কারখানা খুললেও কাটেনি অনিশ্চয়তা। বিদেশি ক্রেতাদের কারখানা পরিদর্শন বাতিল, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব এবং নতুন ক্রয়াদেশ ভারত, ভিয়েতনামসহ প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে পণ্য সরবরাহের চাপও বাড়ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এখন বড় চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা। এদিকে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
গত ৩১ অক্টোবর থেকে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও মিরপুরে শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয়। পরে তা ময়মনসিংহসহ অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার।
৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভায় সিদ্ধান্ত হয়, নতুন মজুরি কাঠামো ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। ডিসেম্বরের বেতন জানুয়ারিতে নতুন কাঠামো অনুযায়ী দেওয়া হবে। তবে মজুরির পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
অন্য দেশে চলে যেতে পারে ক্রয়াদেশ : বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
ক্রেতারা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন। শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশেও পড়তে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কয়েকজন বিদেশি ক্রেতা পূর্বনির্ধারিত কারখানা পরিদর্শন বাতিল করেছেন। একটি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের কিছু ক্রয়াদেশ ভারত ও ভিয়েতনামে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। ইন্দোনেশিয়াও বিকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
ব্যয় বাড়ছে, দাম কমানোর চাপ : ক্লিফটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মহিউদ্দিন চৌধুরী রয়টার্সকে বলেন, সব দিক থেকেই উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। অথচ ক্রেতারা পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। অনেক কারখানার মুনাফার হার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। ফলে বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার সুযোগ সীমিত।
অর্থনীতির শিক্ষক সেলিম রায়হানের মতে, শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করে দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। সময়মতো পণ্য সরবরাহ, মান বজায় রাখা ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কয়েক বছর পর পর মজুরি নিয়ে একই ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে স্থায়ী মজুরি কমিশন গঠন প্রয়োজন।
এদিকে পোশাকশিল্পের সাম্প্রতিক অস্থিরতায় অর্থায়নের অভিযোগ তদন্ত করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ বিষয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
রপ্তানিতে পোশাকের ওপর নির্ভরতা : বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে পণ্য রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ৭০৪ কোটি ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। এ সময় তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ৩৭১ কোটি ডলারের।
প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থাননির্ভর এ শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি।
শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক হচ্ছে পরিস্থিতি, সতর্ক পুলিশ : গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন বেশির ভাগ কারখানা বন্ধ থাকলেও গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ার বেশ কিছু কারখানায় উৎপাদন চলেছে। কোথাও নতুন করে বিক্ষোভ বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী, রূপনগর, ১০ নম্বর গোলচত্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় কারখানার সামনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ছুটির দিন শ্রমিকদের সড়কে নামতে দেখা যায়নি। মাইকিং করে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে পুলিশ। জলকামানসহ আধুনিক সরঞ্জামও প্রস্তুত রাখা হয়।
গাজীপুর : গাজীপুরে জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। তবে শিপমেন্টের চাপ থাকায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কারখানায় সীমিত পরিসরে কাজ হয়েছে। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, কিছু কারখানায় অতিরিক্ত সময়ের ভিত্তিতে উৎপাদন চালানো হয়েছে। আজ শনিবার বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গতকাল বিকেলে গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় আন্দোলনের সময় নিহত পোশাক শ্রমিক তৌফিক হোসেনের রুহের মাগফিরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এনসিপির শ্রম সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলী নাছের খানের নেতৃত্বে দলটির নেতাকর্মী এবং এবি পার্টির নেতারা এতে অংশ নেন।
সাভার ও আশুলিয়া : সাভার ও আশুলিয়ায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও জরুরি প্রয়োজনে ৮৮টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন চলেছে। শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, এসব কারখানায় শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে উৎপাদন সচল রাখা প্রয়োজন। তবে তাঁদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ : নারায়ণগঞ্জেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পোশাকশিল্পের চলমান অসন্তোষ ও ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শুক্র ও শনিবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে বিকেএমইএ। নিরাপত্তার জন্য মাঠে রয়েছে চার প্লাটুন বিজিবি, এসআরবির চারটি টহল দল ও জেলা পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, মালিকরা শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছেন। জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বিশেষ নজরদারি চলছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সহিংসতায় জড়িত ও উসকানিদাতাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় করা দুটি মামলায় এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের সভাপতিত্বে এবং সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদের উপস্থিতিতে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের সমন্বয়ে বৈঠক হয়। সেখানে আলোচনা ও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সংকট নিরসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
0 মন্তব্য