বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাড়ির বাজার চীনে যখন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র মূল্যযুদ্ধ চলছে এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তখন বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে বেইজিং। একই সঙ্গে আরও কঠোর নিরাপত্তা বিধিমালাও চালু করেছে দেশটি।
চীন জানিয়েছে, ২০২৭ সাল থেকে গাড়িতে লুকানো দরজার হাতল নিষিদ্ধ করা হবে। এর ফলে টেসলার মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া এবং চীনের স্থানীয় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এই নকশা প্রথমবারের মতো কোনো দেশে ধীরে ধীরে বাদ পড়তে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে টেসলা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি। জিলি ও এক্সপেং মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আর শাওমি জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিজ্ঞপ্তির বাইরে তাদের কাছে অতিরিক্ত কোনো তথ্য নেই।
লিপমোটর জানিয়েছে, নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আপগ্রেডের মধ্যে সতর্কতামূলক লেবেল যুক্ত করা এবং পাওয়ার-উইন্ডো নিয়ন্ত্রণের সফটওয়্যার আপডেট করা হয়েছে। তবে ব্যবহারকারীদের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে রিকল প্রক্রিয়ার নিয়ম মেনে বিষয়টি পরিচালনা ও নথিভুক্ত করা হচ্ছে।
চীনা আইনে পণ্য প্রত্যাহার হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ এসব পদক্ষেপের বেশিরভাগই জরুরি অবস্থায় যান্ত্রিকভাবে দরজা খোলার হাতলকে কেন্দ্র করে। নিয়ন্ত্রকদের মতে, দুর্ঘটনার সময় এসব হাতল খুঁজে বের করা বা ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে। আগুনে গাড়ির ভেতরে যাত্রী আটকা পড়ার কয়েকটি ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গত অক্টোবরে জানিয়েছিল, একটি শাওমি এসইউ৭ সেডান দুর্ঘটনার পর আগুন ধরে গেলে চালক মারা যান। পথচারীরা গাড়িটির দরজা খুলে তাকে বের করতে পারেননি।
সতর্কতামূলক লেবেল ও সফটওয়্যার আপডেট
এই বিপুলসংখ্যক গাড়ি প্রত্যাহার একদিকে চীনের বিশাল গাড়ির বাজারের আকার তুলে ধরছে। অন্যদিকে, গাড়িতে সফটওয়্যারের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত ত্রুটির বিষয়ে নিয়ন্ত্রকদের কঠোর নজরদারির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
টেসলা ও শাওমিসহ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দরজার হাতল সহজে শনাক্ত করার জন্য বিনামূল্যে সতর্কতামূলক লেবেল লাগাবে। পাশাপাশি বেশিরভাগ কোম্পানি ওভার-দ্য-এয়ার বা দূর থেকে সফটওয়্যার আপডেট দেবে।
টেসলার প্রত্যাহার করা গাড়ির সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফর মার্কেট রেগুলেশনকে (এসএএমআর) দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে আমদানি করা এবং চীনে তৈরি প্রায় ২৯ লাখ ৮০ হাজার মডেল ৩, মডেল ওয়াই, মডেল এস ও মডেল এক্স গাড়ি প্রত্যাহার করবে কোম্পানিটি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, টেসলা জানিয়েছে, বড় ধরনের সংঘর্ষ বা বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বিকল হওয়ার পর যান্ত্রিক জরুরি দরজা খোলার হাতল শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। এতে যাত্রীদের গাড়ি থেকে বের হওয়া কিংবা উদ্ধারকারীদের ভেতরে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টেসলার নেয়া পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে সতর্কতামূলক লেবেল এবং দূর থেকে পাঠানো সফটওয়্যার আপডেট। এই আপডেটের মাধ্যমে দুর্ঘটনার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির জানালা নামানোর ব্যবস্থা করা হবে।
টেসলা ও শাওমি ছাড়াও লিপমোটর, এক্সপেং ও জিলি হোল্ডিং এসএএমআরের কাছে জমা দেয়া নথিতে বড় আকারের গাড়ি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।
শাওমি প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার, লিপমোটর প্রায় ৩ লাখ ৭১ হাজার এবং এক্সপেং প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার গাড়ি প্রত্যাহার করবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করা অন্য কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কমসংখ্যক গাড়ি প্রত্যাহার করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান অটোফোরকাস্ট সলিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্যাম ফিওরানি বলেন, এসব পদক্ষেপের খরচ তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে। আধুনিক ওভার-দ্য-এয়ার আপডেট বড় ধরনের রিকলের খরচ ও গাড়ি বন্ধ থাকার সময় কমিয়ে দেয়। এমনকি প্রয়োজনীয় শারীরিক কাজের খরচও অতীতের বড় রিকলের তুলনায় খুব বেশি হবে না বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রেও নজরে দরজার হাতল
কি-ফব, স্মার্টফোন কিংবা স্পর্শ-সংবেদনশীল প্যানেলের মাধ্যমে খোলা যায়; এমন দরজার হাতল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকদেরও নজরে এসেছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনএইচটিএসএ) জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় গাড়ির ভেতরে যাত্রী আটকা পড়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা নতুন নিরাপত্তা মানদণ্ড বিবেচনা করছে।
তবে শুক্রবার সন্ধ্যায় এনএইচটিএসএ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে একই ধরনের রিকল দেয়ার পরিকল্পনার কথা কোনো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সংস্থাটিকে জানায়নি।
সূত্র- রয়টার্স
0 মন্তব্য