কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি মধ্যম পাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানোর দাবি করেছে উত্তর কোরিয়া।
পিয়ংইয়ংয়ের এ দাবি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। সিউলের দাবি অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি ৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে।
দুই কোরিয়ার সীমান্তবর্তী অসামরিকীকৃত এলাকা (ডিএমজেড) ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই এ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঘটনা ঘটল। গত মাসে ডিএমজেড এলাকায় একটি বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনাসদস্য আহত হন। এ ঘটনার জন্য পিয়ংইয়ংকে দায়ী করে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছিল সিউল। তবে উত্তর কোরিয়া ওই বিস্ফোরণের দায় অস্বীকার করেছে। উল্টো গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থানকে ‘নিন্দনীয়’ বলে মন্তব্য করে পিয়ংইয়ং।
এর ফলে দুই দেশের বেসামরিক নেতৃত্বের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরুর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের বোন কিম ইয়ো-জং জানান, সকালে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল একটি ‘মধ্যম পাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র’।
তিনি দাবি করেন, ক্ষেপণাস্ত্রটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। তবে কীভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
কিম ইয়ো-জংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি কম উচ্চতায় উড়ার সময় নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম। এ ধরনের সক্ষমতার কারণে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে প্রতিহত করা কঠিন হতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, উত্তর কোরিয়া যখন ক্ষেপণাস্ত্রে ‘ঢেউয়ের মতো আঁকাবাঁকা গতিপথের মোড’ ব্যবহার করেছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে গতিপথের পরিবর্তন শনাক্ত করার পরও পরবর্তী সময়ে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ট্র্যাক বা নজরদারিতে রাখতে পারেনি।
গত মাসেই উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন দেশটির অস্ত্র ব্যবস্থায় ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্তর’ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। এর পরই ক্ষেপণাস্ত্রে এআই ব্যবহারের বিষয়ে কিম ইয়ো-জংয়ের এ দাবি সামনে এলো।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়তার জন্য রাশিয়ায় সেনা পাঠানোর বিনিময়ে মস্কোর কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। এর ফলে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়নও দ্রুততর হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিউলভিত্তিক কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং সুং-পিও এএফপিকে বলেন, বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও এর বাইরে নয়।
তার মতে, এআই লক্ষ্যবস্তুর তথ্য বিশ্লেষণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে। ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার এসব অস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে—এমন উদাহরণও দেখা গেছে।
তবে উত্তর কোরিয়ার নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে পিয়ংইয়ংয়ের দাবি এখনই নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন হং সুং-পিও।
তার মতে, বিশ্বের শীর্ষ সামরিক শক্তিগুলোর তুলনায় উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এখনও খুব বেশি উন্নত নয়। লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন হলেও, এর অর্থ এই নয় যে সেগুলো প্রতিবার নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।
এদিকে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ঘনিষ্ঠভাবে তথ্য আদান-প্রদান করছে। পিয়ংইয়ংয়ের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার দাবির পরও এ তিন দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান বজায় রেখেছে।
0 মন্তব্য