কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার আশ্রয়ের ৯ বছর পূর্ণ হতে চললেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে রয়েছে। নিজ দেশে ফেরার পথ তৈরি না হওয়ায় একদিকে যেমন শরণার্থীদের দিন কাটছে চরম অস্বস্তি ও পরাধীনতায়, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতি ও সুরক্ষায় তৈরি হচ্ছে নানামুখী সংকট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সমস্যার রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সমাধান না হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গার একটি তালিকা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের পর নেপিদো মাত্র আড়াই লাখ মানুষকে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে।
এরপর ঢাকা ও নেপিদোর মধ্যে একাধিকবার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হলেও কার্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক জান্তা ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত করে তুলেছে।
কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাগরিক অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই কেবল তাঁরা নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে চান।
উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের এক রোহিঙ্গা নাগরিক বলেন, আমরা আমাদের মৌলিক অধিকার ও নাগরিক মর্যাদা নিয়ে ফিরতে চাই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশে যেভাবে আমরা নিরাপদে আছি, তেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে আমরা আজই চলে যাব।
আরেকজন রোহিঙ্গা জানান, মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মতো তাঁদেরও যদি সমান নাগরিক অধিকার ও পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেওয়া হয়, তবেই তাঁরা ফিরবেন; অন্যথায় এই অনিশ্চিত জীবনের অবসান দেখছেন না তাঁরা।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনার পর প্রত্যাবাসন নিয়ে মাঝখানে কিছুটা আশা জাগলেও, রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি এখন থমকে গেছে।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দিন দিন আরও জটিল রূপ ধারণ করছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এই ইস্যুটিকে সচল রাখতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা ও আলোচনা আরও জোরদার করা জরুরি।
উল্লেখ্য, সরকারি হিসাবে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ বলা হলেও, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত ৯ বছরে জন্মহার বৃদ্ধি এবং নতুন করে অনুপ্রবেশের ফলে এই সংখ্যা বর্তমানে ১৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এত বিশাল জনগোষ্ঠীর অবস্থান স্থানীয় পরিবেশ ও সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রতিনিয়ত বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
0 মন্তব্য