যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং দেশটি এখন ‘শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার আগে শেষ সুযোগের’ মুখোমুখি। যদিও তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা চলছে না।
সোমবার (৩ আগস্ট) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ কয়েকটি দেশের অনুরোধে তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন।
একই দিনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলার বিষয়টি অস্বীকার করলেও ট্রাম্প বলেন, “আমরা এই মুহূর্তেও কথা বলছি।”
তিনি আরও বলেন, “ভালো একটি চুক্তিতে সই করার জন্য এটি তাদের শেষ সুযোগ। শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার আগে আমি তাদের সর্বশেষ সুযোগ দিতে চাই।”
ট্রাম্প জানান, আলোচনার মূল বিষয় দুটি হলো— কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালি খুব দ্রুত, এমনকি “আগামীকালই” খুলে যেতে পারে, তবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংঘাত চলছে। মাঝেমধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের কারণে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও পাঁচ মাসের বেশি সময় পরও ইরান অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। পাশাপাশি দেশটি এখনো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বজায় রেখেছে।
গত সপ্তাহেও ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে শনিবার তিনি অবস্থান কিছুটা নরম করে বলেন, একটি সম্ভাব্য চুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান আবারও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, “আমাদের আলোচনা হচ্ছে ওমানের সঙ্গে, যাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা যায়।”
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধই যুদ্ধ অবসানের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ইরান আবারও এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে কার্যত অবরোধ আরোপ করে। এতে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধার মুখে পড়ে এবং কয়েকটি জাহাজের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে “প্রতারণাপূর্ণ” আখ্যা দিয়ে লেখেন, “ইরান স্বীকার করুক বা না করুক, আমরা বহুদিনের একটি সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করছি।”
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবরোধ কার্যকর রয়েছে। ট্রাম্প বলেন, “আমরা না চাইলে ইরানে কিছুই প্রবেশ করবে না, আর কোনো চুক্তি বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।”
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ চলাচল থাকলেও বর্তমানে ইরান ওই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এবং জাহাজ চলাচলের জন্য ফি আদায় করতে চায়, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানও ইরানি উপকূলঘেঁষা নির্ধারিত পথ ছাড়া অন্য কোনো রুটে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে রাজি নয়।
রোববার ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানান, ওমানের সঙ্গে এমন একটি নৌপথ নির্ধারণে দুই দেশ কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা উভয় পক্ষের সার্বভৌম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এর অর্থ এই নয় যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে।
এদিকে রোববার ওমান উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজের পাশেই বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO)। তবে জাহাজ ও এর সব নাবিক নিরাপদ রয়েছেন।
ট্রাম্প আবারও জোর দিয়ে বলেন, “ইরানের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ অবশ্যই হতে হবে।” পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তেহরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
সপ্তাহান্তে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্র দেশ তাকে নতুন করে হামলা না চালানোর অনুরোধ জানিয়েছিল। তার দাবি, সেই হামলা হলে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান হতো। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
0 মন্তব্য