মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা বুধবারের মধ্যেই হতে পারে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করা হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়ায় সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে সারাদিন ধরে আলোচনা হয়েছে এবং আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আজকের আলোচনা খুবই ভালো হয়েছে। আশা করছি আগামীকাল বা তার পরদিনই একটি চুক্তি হতে পারে।
এর আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও কড়া ভাষায় বলেন, “হরমুজ প্রণালি খুব শিগগিরই খুলে যাবে। তা না হলে তারা খুব কঠোর আঘাতের মুখে পড়বে, এরপরও প্রণালি খুলে যাবে। সেখান থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় লড়াই।
বুধবার বা বৃহস্পতিবার চুক্তির আশা
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সিএনবিসিকে বলেন, বুধবার বা বৃহস্পতিবারের মধ্যেই একটি সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল। মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত উৎস থেকে ছোড়া প্রজেক্টাইলের আঘাতে একজন নাবিক নিখোঁজ হন। একই দিনে ইয়েমেন উপকূলের লোহিত সাগরে একটি ভারতীয় জাহাজও হামলার পর ডুবে যায়। তবে জাহাজটির সব নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে।
ইরানের অস্বীকৃতি, ট্রাম্পের পাল্টা দাবি
ট্রাম্প গত সপ্তাহেও ইরানকে কঠোর হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, যদিও পরে তিনি ইঙ্গিত দেন যে একটি সমঝোতা কাছাকাছি।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না বলে দাবি করেছে। তবে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, আলোচনা চলছে এবং তা ইতিবাচক দিকেই এগোচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাড়ানোর বিষয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রও সম্পৃক্ত রয়েছে।
৬০ দিনের অন্তর্বর্তী চুক্তির আলোচনা
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর জন্য একটি ৬০ দিনের অন্তর্বর্তী চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই চুক্তির আওতায় ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী জলপথে নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা হবে। ওয়াশিংটন বুধবারই এ ঘোষণা দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাতারের মধ্যস্থতা
আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কাতার। দেশটির আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। কাতারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উভয় নেতা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে বর্তমানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান ঘটানো। যদিও তিনি স্বীকার করেন, নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগতে পারে।
এর আগে ট্রাম্প ইরানকে “প্রতারণাপূর্ণ” বলে মন্তব্য করে বলেন, কোনো সমঝোতা বা “সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ” না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন পাল্টা অবরোধ বহাল থাকবে।
যুদ্ধের প্রভাব ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা
পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের মধ্যেও ইরান এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ঘাঁটি এবং বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, মঙ্গলবার ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজ অজ্ঞাত উৎসের প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরান এখনও কার্যত হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং জাহাজগুলোকে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই পারাপার করতে বলছে।
এদিকে হরমুজে অচলাবস্থার কারণে লোহিত সাগরের নৌপথের গুরুত্ব বেড়েছে। তবে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবগামী নৌপথে অবরোধ ঘোষণা করে একাধিক জাহাজে হামলার দাবি করেছে।
সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে দেশটি হরমুজ এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখছে। অন্যদিকে, মঙ্গলবার ইয়েমেন উপকূলে হামলার পর ভারতীয় জাহাজ এমএসভি ফাইজে নূরে অলিয়া ডুবে গেলেও এর সব নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।
লোহিত সাগর সুয়েজ খালের প্রধান প্রবেশপথ হওয়ায় এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হুথিদের আগের হামলার কারণে অনেক জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হতে হয়েছিল।
0 মন্তব্য