ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে সিরিয়ার ওপর থাকা কিছু রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে এবং দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা দেওয়ার পথও খুলবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানান, হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর ‘বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ (এসডিজিটি) তকমাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা, যিনি আগে আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি নামে পরিচিত ছিলেন, একসময় আল-কায়েদার শাখা হিসেবে পরিচিত এইচটিএস-এর নেতা ছিলেন।
রুবিও বলেন, “এই পদক্ষেপগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে সিরিয়ার জনগণকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।”
গত সপ্তাহে ইসরায়েল সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে বোমা হামলা চালানোর পর ওয়াশিংটন ও দামেস্কের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সিরিয়ার প্রধান বিদেশি সমর্থক তুরস্কের সঙ্গেও উত্তেজনা তৈরি হয়।
তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক গত সপ্তাহে ওই হামলাকে “গুরুতর ও উদ্বেগজনক” বলে মন্তব্য করেন। তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন যে, ইসরায়েল হয়তো তুরস্ককে যুদ্ধে জড়ানোর জন্য পরিস্থিতি উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিল।
গত মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু করেন। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে শারার সঙ্গে বৈঠক ছিল তাঁর তুরস্ক সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।
শারার জন্য ওই বৈঠক ছিল একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। এর আগে এক বছরের কিছু বেশি সময় আগে সৌদি আরবের রিয়াদে প্রথমবার ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে নভেম্বরে তিনি হোয়াইট হাউসে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বহু দশক ধরে কোনো সিরীয় নেতা—বিশেষ করে শারার মতো অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকায় থাকা কোনো ব্যক্তি—হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেননি।
১৯৭৯ সাল থেকে তালিকায় সিরিয়া
১৯৭৯ সালে সিরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তখন দেশটির ক্ষমতায় ছিলেন বাশার আল-আসাদের বাবা হাফেজ আল-আসাদ।
শীতল যুদ্ধের সময় সিরিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পেত। হাফেজ আল-আসাদ যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের প্রতিপক্ষ উভয়ের সঙ্গেই যোগাযোগের পথ খোলা রাখলেও লেবানন এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের প্রশ্নে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
সিরিয়ার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে বড় পদক্ষেপ
শারার সঙ্গে ট্রাম্পের দ্রুত ঘনিষ্ঠতা গত এক বছরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প তাকে “অসাধারণ”, “অত্যন্ত সম্মানিত” এবং “কঠোর” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সোমবারের সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি হয় ২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্পের জারি করা একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে। ওই আদেশে সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে শারা সরকারের অধীনে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম ও ইতিবাচক পরিবর্তনের মূল্যায়ন এবং দামেস্কের দেওয়া আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তাগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
রুবিও বলেন, “গত এক বছরে সিরিয়া সরকার সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।” এর মধ্যে নভেম্বরে আইএসআইএস পরাজিত করতে গঠিত বৈশ্বিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়া এবং আইএসআইএস, আল-কায়েদা, হিজবুল্লাহ ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে অভিযান পরিচালনার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
রুবিও আরও বলেন, সিরিয়াকে এসএসটি তালিকা থেকে এবংএইচটিএস-কে এসডিজিটি তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ফলে দেশটিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে থাকা বড় বাধাগুলো দূর হবে। একই সঙ্গে সিরিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনঃএকীভূত হওয়ার পথও সহজ হবে।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির সহযোগী ফেলো নাতাশা হল এর আগে এই সিদ্ধান্তকে সিরিয়ার জন্য “ভূমিকম্পসম পরিবর্তন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর মতে, এটি সিরিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে থাকা শেষ বড় বাধাগুলোর একটি ছিল।
সিরিয়াকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা সিরিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলও সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছে।
সংগঠনটির গ্রাসরুটস কর্মকর্তা আলবার্তো হার্নান্দেজ বলেন, “এটি মার্কিন নীতির জন্য একটি স্পষ্ট বিজয়। এমনকি শুধু আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি সঠিক পদক্ষেপ।”
0 মন্তব্য