পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশিত ১৮০ দিনের কর্মসূচি ও নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
কমিশনের পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, এই কর্মপরিকল্পনায় বাজার সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বিনিয়োগ শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেছে কমিশন।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজার সংস্কার ও সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে কমিশন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
বিএসইসি’র কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগ শিক্ষা বিস্তারে দেশব্যাপী অনলাইন ও অফলাইন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে। এর মাধ্যমে প্রশিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ানো এবং পুঁজিবাজার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কমিশনে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে এবং বাজার আরও স্থিতিশীল হবে।
কর্মপরিকল্পনায় পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কমিশন। এর মাধ্যমে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে শক্তিশালী ও বিনিয়োগবান্ধব পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে চায় বিএসইসি।
একই সঙ্গে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়বে বলে মনে করছে কমিশন।
আগামী অর্থবছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ লক্ষ্যে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন করা হবে। কমিশনের মতে, এর ফলে বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও অন্যান্য অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারে ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে থাকা অদাবীকৃত লভ্যাংশ ও শেয়ার প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের কাছে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
স্টার্ট-আপ ও এসএমই খাতের জন্য ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ চালুর উদ্যোগও রয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ায় ৩০ দিনের মধ্যে তালিকাভুক্তির সুবিধা দেওয়া হবে। পাশাপাশি আবেদন ও অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা হবে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুঁজিবাজার শিক্ষা সম্প্রসারণে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা ও বিনিয়োগ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হবে।
পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় শক্তিশালী বন্ড ও ইক্যুইটি মার্কেট গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে করপোরেট বন্ড, সুকুক, গ্রিন বন্ড এবং এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) সম্প্রসারণে যুগোপযোগী আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদ- অনুসরণ করে টেকসই বন্ড কাঠামো উন্নয়নের কাজও চলছে।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ‘ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট (এফপিআই) অনবোর্ডিং পোর্টাল’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিও হিসাব খোলা, মূলধন প্রত্যাবাসন এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ‘পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল’ আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়মের তথ্য প্রকাশকারীদের (হুইসেলব্লোয়ার) সুরক্ষায় পৃথক বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বিএসইসি মনে করছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
0 মন্তব্য