নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) শাখা ছাত্রদলের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, একের পর এক গ্রুপভিত্তিক দ্বন্দ্ব, প্রকাশ্য সংঘর্ষ, শোকজের পর এবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের বহিষ্কারাদেশে সাংগঠনিক সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শাখা ছাত্রদলের দুই নেতাকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। সংগঠন সংশ্লিষ্টদের দাবি, বহিষ্কৃত দুই নেতা শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি সাব্বির হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ফলে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
শনিবার (২ আগস্ট) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন সায়েম এবং প্রচার সম্পাদক খায়রুল আমান শাওনকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। তবে ঠিক কি ধরণের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে তার নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয় নি।
নোবিপ্রবি ছাত্রদল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নোবিপ্রবি ছাত্রদলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই অন্তত চারটি পৃথক বলয় সক্রিয়। সভাপতি জাহিদ হাসান, সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান, সিনিয়র সহ-সভাপতি সাব্বির হোসেন এবং সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলামের অনুসারীরা আলাদা বলয়ে অবস্থান করছেন। বহিষ্কৃত দুই নেতাকে সিনিয়র সহ-সভাপতি সাব্বির হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও কেন্দ্রীয় বহিষ্কারাদেশে কোনো গ্রুপ বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগে নোবিপ্রবি ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসে গত এপ্রিল মাসে। সাবেক উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি সাব্বির হোসেনের সঙ্গে প্রতিপক্ষ বলয়ের বিরোধ চরমে পৌঁছায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিনিকেতন এলাকায় তাকে টেনেহিঁচড়ে এবং চ্যাংদোলা করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনাটির ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ওই ঘটনার পর সাব্বির হোসেন অভিযোগ করেন, দলের ভেতরের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্তরা বিষয়টিকে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ভুল বোঝাবুঝি বলে দাবি করেন। শাখা সভাপতিও সে সময় ঘটনাটি আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তবে সংঘাত সেখানেই থেমে থাকেনি। ঘটনার দুই দিন পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নোবিপ্রবি শাখার পাঁচ নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। নোটিশে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে লিখিত ব্যাখ্যা তলব করা হয়। সেই তালিকায় ছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতি সাব্বির হোসেন, সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সহ-সভাপতি আশিকুর রহমান জীবন, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাকসুদুর রহমান মারুফ।
এছাড়া সংগঠন-সংশ্লিষ্টদের সূত্র মতে, নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলে দীর্ঘদিন ধরে চলা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, পৃথক বলয়ের আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগে নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদল বারবার আলোচনায় এসেছে। সর্বশেষ বহিষ্কারাদেশকে সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি সাখাওয়াত সায়েম এ বিষয়ে বলেন," আমাদের সংগঠনের একটা সংস্কৃতি আছে কোনো সমস্যা তৈরি হলে জবাব চাওয়া হয় কিন্তু আমাদের কোনো ধরণের অবহিতকরণ নোটিশ ছাড়াই আমাদের বহিস্কার নোটিশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সংগঠনের এটা কালচারের মধ্যে পড়ে না।
এদিকে বহিষ্কৃত প্রচার সম্পাদক খায়রুল আমান শাওন বলেন, "বহিষ্কারের আগে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল আমার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়নি। আমি দলের দুঃসময়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম এবং আদর্শবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে জড়াইনি। বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কিছু সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমার মতপার্থক্য ছিল। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশের পর আমরা নৈতিক অবস্থান থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিলাম। যদি সেই ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে এ সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে তা দুঃখজনক। তবে সংগঠনের সব সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান করি।"
এ বিষয়ে নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ হাসান বলেন, “বহিষ্কারাদেশে স্পষ্টভাবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, এখানে ব্যক্তিগত অনুসারী বা গ্রুপিংয়ের কোনো বিষয় নেই। ছাত্রদলে রাজনীতি করতে হলে সংগঠনের নিয়ম, নীতি ও শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। কেউ যদি সংগঠনের নীতিমালা অনুসরণ না করেন বা নিয়মের বাইরে কাজ করেন, তাহলে সংগঠন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।”
এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের এ সিদ্ধান্তের পর ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে নোবিপ্রবি ছাত্রদলের দীর্ঘদিনের গ্রুপিং আবারো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
0 মন্তব্য