শুক্র গ্রহের কোনো চাঁদ নেই কেন এর নতুন এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক একদল বিজ্ঞানী। তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী, শুক্রের একসময় হয়তো একটি প্রাকৃতিক উপগ্রহ বা চাঁদ ছিল। তবে গ্রহটির ধীর ঘূর্ণনের কারণে সেই চাঁদ ধীরে ধীরে শুক্রের কাছে চলে আসে। এক পর্যায়ে সেটি শুক্রের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে গ্রহটির ভেতরে মিশে যায়।
সহজভাবে বললে, শুক্র একসময় নিজের চাঁদকে ‘খেয়ে ফেলেছে’। বিজ্ঞানীরা ঘটনাটিকে একধরনের মহাজাগতিক আত্মভক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। সূর্য থেকে দ্বিতীয় গ্রহ শুক্র। আকার, ভর ও গঠনের দিক থেকে পৃথিবীর সঙ্গে এর অনেক মিল রয়েছে। এ কারণে শুক্রকে অনেক সময় পৃথিবীর ‘যমজ’ গ্রহ বলা হয়। কিন্তু পৃথিবীর একটি চাঁদ থাকলেও শুক্রের কোনো প্রাকৃতিক উপগ্রহ নেই। শুক্রের এই রহস্যের ব্যাখ্যা দিতে নতুন তত্ত্বটি দিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিভারসাইড শাখার বিজ্ঞানীরা। তাদের গবেষণা সোমবার ‘দি অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও জ্যোতির্পদার্থবিদ স্টিফেন ক্রেন রয়টার্সকে বলেন, শুক্রের কোনো চাঁদ থেকে থাকলে সেটি দীর্ঘ সময় গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করতে পারত না। শুক্র নিজের অক্ষে খুব ধীরে ঘোরে। এ কারণেই কোনো প্রাকৃতিক উপগ্রহ একসময় শুক্রকে প্রদক্ষিণ করে থাকলে সেটি ধীরে ধীরে গ্রহটির আরো কাছে চলে আসত। শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ সংঘর্ষে সেই চাঁদ শুক্রের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গ্রহটির ভেতর মিশে যেত।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন শুক্রের নিজের অক্ষে ঘোরার গতির ওপর।
শুক্র নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে পৃথিবীর হিসাবে প্রায় ২৪৩ দিন সময় নেয়। অর্থাৎ গ্রহটি অত্যন্ত ধীরে ঘোরে। এমনকি সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে শুক্রের যত সময় লাগে, নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে তার চেয়েও বেশি সময় লাগে। অন্যদিকে পৃথিবী নিজের অক্ষে একবার ঘুরে মাত্র ২৪ ঘণ্টায়। ক্রেনের মতে, পৃথিবী শুক্রের তুলনায় ২০০ গুণেরও বেশি দ্রুত নিজের অক্ষে ঘোরে। এই পার্থক্য গ্রহের চারপাশে থাকা চাঁদের গতিবিধিতে বড় প্রভাব ফেলে।
বিজ্ঞানীরা গ্রহের পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন নিয়ম ব্যবহার করে কম্পিউটার মডেল তৈরি করেন। এতে বিভিন্ন আকারের কাল্পনিক চাঁদকে শুক্রের চারপাশে রেখে তাদের গতিবিধি পরীক্ষা করা হয়। মডেলগুলোতে দেখা যায়, চাঁদের আকার যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি একই হওয়ার কথা। কোনোটি দ্রুত, কোনোটি কিছুটা দেরিতে হলেও শুক্রের দিকে এগিয়ে যাবে এবং একসময় গ্রহটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বে। ক্রেন বলেন, শুক্রের কোনো চাঁদ থাকলে গ্রহটি সেটিকে দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারত না।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, শুক্রের ইতিহাসের প্রথম ১০০ কোটি বছরের মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। সৌরজগতের বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। অর্থাৎ শুক্রের জন্মের পরের তুলনামূলক শুরুর সময়েই তার সম্ভাব্য চাঁদটি গ্রহটির সঙ্গে সংঘর্ষে ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে। তবে শুক্রের সত্যিই কোনো চাঁদ ছিল- এমন সরাসরি প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। এর আগে বিজ্ঞানীরা শুক্রের চাঁদ না থাকার বিষয়ে কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। একটি ধারণা ছিল, শুক্র শুরু থেকেই কোনো চাঁদ তৈরি করতে পারেনি।
আরেকটি ধারণা হলো, কোনো সময় শুক্রের একটি চাঁদ ছিল, কিন্তু অন্য কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে সেটি ধ্বংস হয়ে যায়।
নতুন গবেষণার তত্ত্ব এসব ব্যাখ্যা থেকে আলাদা। এখানে মূল কারণ হিসেবে শুক্রের ধীর ঘূর্ণনকে দেখানো হয়েছে। গবেষণায় পৃথিবী ও চাঁদের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পৃথিবী দ্রুত নিজের অক্ষে ঘোরে। এই ঘূর্ণনের শক্তির একটি অংশ ধীরে ধীরে চাঁদের কক্ষপথে চলে যাচ্ছে। এর ফলে চাঁদ প্রতি বছর পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ সেন্টিমিটার করে দূরে সরে যাচ্ছে। চাঁদের এই দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি বিজ্ঞানীরা সরাসরি মেপেছেন। ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো-১১ অভিযানের নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠে বিশেষ কিছু আয়না রেখে যান। পৃথিবী থেকে লেজার পাঠিয়ে ওই আয়নায় প্রতিফলিত আলো পরিমাপের মাধ্যমে চাঁদ কতটা দূরে সরে যাচ্ছে, তা নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে শুক্রের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিপরীত হতে পারে। গ্রহটি খুব ধীরে ঘোরায় কোনো সম্ভাব্য চাঁদ ধীরে ধীরে শুক্রের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেটি গ্রহটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে। পৃথিবীর সঙ্গে শুক্রের অনেক মিল থাকলেও এর পরিবেশ অত্যন্ত কঠিন। শুক্র একটি পাথুরে গ্রহ এবং আকারে পৃথিবীর চেয়ে কিছুটা ছোট। কিন্তু এর চারপাশে রয়েছে অত্যন্ত ঘন ও বিষাক্ত বায়ুমণ্ডল। ঘন বায়ুমণ্ডলের কারণে সেখানে ভয়াবহ গ্রিনহাউস প্রভাব তৈরি হয়েছে। এর ফলে শুক্রের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৪৭১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এই তাপমাত্রা এত বেশি যে সেখানে সিসাও গলে যেতে পারে।
রাতের আকাশে সূর্য ও চাঁদের পর শুক্রই সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তুগুলোর একটি। পৃথিবীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরো জানতে বিজ্ঞানীদের কাছে তাই গ্রহটি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেনের মতে, শুক্রের চাঁদ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে চাঁদ তৈরির মতো বড় সংঘর্ষ থেকে শুক্র পুরোপুরি বেঁচে গিয়েছিল- এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর চাঁদ একটি বিশাল মহাজাগতিক সংঘর্ষের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল। পৃথিবীর সঙ্গে একটি বড় মহাজাগতিক বস্তু ধাক্কা খাওয়ার পর ছিটকে যাওয়া পদার্থ থেকে চাঁদ তৈরি হয় বলে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে।
শুক্রের ক্ষেত্রেও এ ধরনের সংঘর্ষ ঘটে থাকতে পারে। সৌরজগতের শুরুর সময় ছিল খুবই অস্থির। তখন অসংখ্য বড় পাথুরে বস্তু মহাকাশে দ্রুত চলাচল করত এবং প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াত। শুক্র সূর্যের পৃথিবীর চেয়ে কাছাকাছি হওয়ায় সেই সময় গ্রহটি তুলনামূলক বেশি মহাজাগতিক সংঘর্ষের মুখে পড়ে থাকতে পারে। শুক্রের অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে আরো তথ্য পেতে বিজ্ঞানীরা এখন নতুন দুটি মহাকাশ অভিযানের দিকে তাকিয়ে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পরিকল্পনায় রয়েছে ড্যাভিনচি প্লাস ও ভেরিটাস নামে দুটি অভিযান।
এই দুই অভিযান ২০২০-এর দশকের শেষ দিকে অথবা ২০৩০-এর দশকের শুরুতে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। অভিযান দুটির মাধ্যমে শুক্রের বায়ুমণ্ডল, পৃষ্ঠ এবং ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
0 মন্তব্য